Tuesday, July 19, 2022

34>|| একলব্যে +| কৃষ্ণ +সাত্যকি= युयुधान,||

   34>|| একলব্যে +| কৃষ্ণ +সাত্যকি= युयुधान,||


     || একলব্যে ||

পূর্বানুবৃত্তি: বিচক্ষণ যুধিষ্ঠির ধরতে পারে কেমন করে দ্রোণের প্রশিক্ষণ গোপনে আয়ত্ত করেছে একলব্য। অন্য দিকে কুন্তী এবং তাঁর সন্তানদের সম্পর্কে ভীষ্মসমীপে নানা কদর্য ইঙ্গিত করে চলেন ধৃতরাষ্ট্র ও শকুনি। তীব্র রাগে ভীষ্ম প্রতিবাদ করলে ধৃতরাষ্ট্র জানান, তাঁর অভিযোগ আছে অস্ত্রশিক্ষক দ্রোণের বিরুদ্ধেও। সে সময় দ্রোণ বিভ্রান্ত একলব্যকে নিয়ে। শুধুমাত্র অর্জুনকে প্রদেয় তাঁর যাবতীয় শিক্ষা যদি একান্ত গুপ্তই না থাকে, তা হলে অর্জুনের নিরঙ্কুশ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন কেমন করে সম্ভব!

====================

একলব্যের অস্ত্রসম্ভার নির্মাণে বন্য পশুর অস্থি আর শৃঙ্গ ছাড়াও ব্যবহৃত হয়েছে দৃঢ় ও ঘাতসহ নানাবিধ কাষ্ঠ-উপাদান। অরণ্য-সম্পদ থেকেই একলব্য খুঁজে নিয়েছে নানা বেধের শরশলাকা— সূক্ষ্ম থেকে স্থূল, লঘু থেকে গুরু— সমস্ত প্রকার! ওই পর্ণকুটিরের অভ্যন্তরেইতার নানাবিধ নিজস্ব পরীক্ষানিরীক্ষা চলে, গুরুর শিক্ষাপদ্ধতি অনুসরণ করেও স্ববুদ্ধিতে মৌলিক গবেষণা করতে শিখেছে সে রীতিমতো!

যে বিষয়টি সর্বাধিক চমকিত করল দ্রোণকে তা হল, অস্ত্রের ফলকে লেপন করার জন্য এই নিষাদ সংগ্রহকরেছে নানাবিধ বিষ! অধিকাংশই নিজস্ব উদ্ভাবন। বন্য গাছগাছড়া, বিষাক্ত ফল, কীটপতঙ্গের হুল, ভেকের গরলগ্রন্থি, উন্মাদ-রোগগ্রস্ত পশুর লালারস। আর, সর্পবিষ! অর্থাৎ, রসায়নাগারের রন্ধ্রপথে এ কিশোর বিষবিদ্যার প্রাথমিক বার্তাটিও আত্মস্থ করেছে!

তিরের ফলায় বিষ-রসায়নের প্রয়োগ, অতি গূঢ় জ্ঞান। বস্তুত এই জ্ঞানই হল ধনুর্বেদের চূড়ান্ত স্তর। যত বড় ধনুর্ধারী, তত এই বিদ্যায় তাঁর সিদ্ধি! লোকমুখে প্রসিদ্ধি এমনই যে, এগুলি দুষ্প্রাপ্য সব ‘মন্ত্রসিদ্ধ’ আয়ুধ; দেব-আশীর্বাদ বিনা এদের নাকি পাওয়া অসম্ভব! নানা অতিরঞ্জিত জনশ্রুতি দিয়ে ঘিরে রাখা হয় এদের। 

সর্বোৎকৃষ্ট স্তরের দিব্যাস্ত্র— যথা ব্রহ্মাস্ত্র, ব্রহ্মশির, পাশুপত— এদের ত্রিভুবন-বিধ্বংসী বলে প্রচার করা হয়। আসলে এই সব অস্ত্রের ফলকে এমন বিরল রসায়ন প্রলিপ্ত থাকে যা অমোঘ, দুশ্চিকিৎস্য, নিশ্চিত প্রাণঘাতী। শ্রেষ্ঠতম ও সচ্চরিত্র ক্ষত্রিয়-যোদ্ধা ও সদ্‌ব্রাহ্মণ ব্যতীত এই বিজ্ঞানের অধিকার কাউকে দেওয়া হয় না, প্রয়োগেরও বিধিনিষেধ অনেক। আবার, যিনি এই সব মৃত্যুমুখ আয়ুধের প্রয়োগ শিখবেন, বাধ্যতামূলক ভাবে তাঁকে নিবারণবিদ্যাও জানতে হবে— অর্থাৎ মারণ-বিষের প্রতিষেধক-

বিজ্ঞানও। বহু দিন ধরে বহু প্রাজ্ঞ সাধকের, মূলত রসায়নজ্ঞ ব্রাহ্মণ ঋষিদের গোপন গবেষণায় উঠে আসা, এই বিষ-বিজ্ঞান ও তার প্রয়োগবিদ্যার নির্যাস।

এ বিদ্যা একান্ত ভাবে গুরুমুখী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে গুরু-শিষ্য পরম্পরায় সঞ্চালিত। গুরুই নির্বাচন করেন, কে উপযুক্ত আধার। তাকেই গোপনে দান করেন গুহ্য-সাধনার উত্তরাধিকার। দ্রোণ পেয়েছিলেন পরশুরামের কাছ থেকে। তিনি নির্বাচন করেছেন অর্জুনকে। অর্জুন এখনও গূঢ়তম জ্ঞানের প্রাথমিক স্তরটিতে রয়েছে মাত্র। কিন্তু তাকেই শ্রেষ্ঠ হতে হবে তার প্রজন্মে। সে নির্বাচিত। ধীরে ধীরে সেই পথে চলেছে সে।

সেখানে, এই নিষাদ-নন্দন! প্রতিভায়, সাধনায়, উদ্ভাবনে... অর্জুনের চেয়েও অগ্রবর্তী! নিঃসন্দেহে! সুতপুত্র বসুষেণের মধ্যে অর্জুনের যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখেছিলেন দ্রোণ, তার আত্মমর্যাদায় আঘাত করে সুকৌশলে বিতাড়িত করেছেন আশ্রম থেকে! কিন্তু এই অনার্যবালক... একে তো নিষ্ক্রান্ত করার পথই নেই। এ একেবারেই প্রকৃতিদত্ত ব্যতিক্রমী মেধা নিয়ে অবতীর্ণ হয়েছে, গুরুর প্রত্যক্ষ সাহায্য ব্যতিরেকেই এত দূর! যদি সত্যই কোনও যোগ্য গুরু একে শ্রেষ্ঠ শিক্ষাটি নিজ উদ্যোগে দান করেন...

দ্রোণ আরও এক বার শ্বাস নিলেন। তার পর তাঁর গুম্ফ ভেদ করে মৃদু হাসি ফুটে উঠল, “তোমার কৃতিত্বে আমি প্রসন্ন হয়েছি, বৎস একলব্য!” সহাস্যবদনে বললেন আচার্য দ্রোণ, “মৃন্ময় মূর্তি নয়, তুমি প্রত্যক্ষ ভাবেই রক্তমাংসের গুরুর শিষ্য হওয়ার যোগ্য। আমি এই মুহূর্তে তোমাকে শিষ্যত্বে বরণ করলাম।”

এক স্বপ্নাতীত হর্ষের বিভা মুহূর্তে নিষাদবালকের কৃষ্ণবর্ণ মুখমণ্ডল উদ্ভাসিত করে তুলল, দ্রোণ স্পষ্ট দেখলেন। কিন্তু তার পশ্চাতে দণ্ডায়মান আর একটি শ্যামল আনন যে সেই একই লহমায় মলিনবিবর্ণ হয়ে গেল, তাও দৃষ্টি এড়াল নাতাঁর। অভিমান-বিস্ময়ের যৌথ অভিঘাত যেন কয়েকটি অশ্রুকণা সঞ্চার করে দিয়েছে দু’টি অক্ষিকোণে!

এক বার অর্জুনের সেই ম্লান, হতাশ মুখের দিকে, এক বার ক্রুদ্ধ সাত্যকির দিকে, এক বার হতভম্ব দুর্যোধন আর অশ্বত্থামার দিকে পর্যায়ক্রমে দেখলেন আচার্য দ্রোণ। তার পর যুধিষ্ঠিরকে বললেন, “অন্তত বিদ্যা-অপহরণের ন্যূনতম পাপটুকুও নবীন শিষ্যের হস্তে লিপ্ত থেকে যাওয়া উচিত নয়, কী বলো জ্যেষ্ঠ কুন্তীনন্দন? কী যেন সামান্য প্রায়শ্চিত্তের কথা বলছিলে তখন?”

“গুরুদক্ষিণা, আচার্য! গুরুকে দক্ষিণা দিয়ে সন্তুষ্ট করলেই...”

একলব্যের দিকে ফিরে আবার হাসলেন ভারদ্বাজ। সুমিষ্ট স্বরে বললেন, “কী? গুরুকে সন্তুষ্ট করার মতো দক্ষিণা প্রদান করতে পারবে তো, বৎস?”

“আদেশ করুন, প্রভু! ফল মধু দুধ মৃগমাংস— যা যা নিয়ে গিয়েছিলাম প্রথম দিন— অর্ধদণ্ডের মধ্যে সব জোগাড় করে আনছি। বা, যদি আরও অন্য কিছু মূল্যবান, দুষ্প্রাপ্য আপনার ইচ্ছা হয়, কিনে আনব বা ধার চেয়ে...” কণ্ঠ কম্পিত হচ্ছিল একলব্যের, অভাবিত আনন্দে, উত্তেজনায়, স্বপ্নপূরণের রোমাঞ্চে, “এই অরণ্যে যা কিছু সংগ্রহ করা সম্ভব, সব... সব...”

“পরিশ্রম করে সংগ্রহ করে আনার মতো দুর্মূল্য দুষ্প্রাপ্য কিছুই নয় সে বস্তু,” দ্রোণ এখনও সহাস্য, “তোমার সঙ্গেই রয়েছে, এখন দক্ষিণা হিসাবে সেটি প্রদানে তুমি সম্মত কিনা, তা-ই দেখার!”

“সঙ্গেই রয়েছে! তা হলে ধরে নিন, আচার্য— সে জিনিস আপনি পেয়েই গিয়েছেন!”

দ্রোণের মুখ থেকে হাস্যলেশ মুছে গেল সহসা। দীর্ঘ দক্ষিণহস্তটি একলব্যের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “তবে দাও হে নিষাদ! দিয়েই দাও...”

-------------======-------=======-----

        || কৃষ্ণ ||

কৃষ্ণকে গভীর ভাবে চিন্তিত ও আলোড়িত দেখাল। আসন থেকে উঠে কিছু ক্ষণ পদচারণা করলেন, গবাক্ষপথে চেয়ে রইলেন বাইরের দিকে। গিরিমালার উপরে নক্ষত্রখচিত, গাঢ় অসিতবরণ নৈশ আকাশ, সেখানে শুক্লা তৃতীয়া তিথির ক্ষীণ শশীকলা। সেই ম্লান চন্দ্রমার দিকে তাকিয়ে বৃষ্ণিশিরোমণি বাসুদেব যেন ধ্যানস্থ হয়ে পড়লেন কয়েক পলের জন্য।

কক্ষে একটিমাত্র ঘৃতপ্রদীপ জ্বলছে। শিনিপুত্র কিশোর সাত্যকি এক বার সম্পূর্ণ কক্ষটিতে দৃষ্টি আবর্তিত করে আনল।

কৃষ্ণ যদুবংশের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব, কিন্তু তাঁর ভবনটিও যেমন সাধারণ-দর্শন, নিজস্ব প্রকোষ্ঠটিও অতি নিরাভরণ ও সম্পূর্ণতই বিলাসবর্জিত। অনেকটাই অন্ধকারে ঢাকা। শুধু সাত্যকি আর কৃষ্ণ যেখানে মুখোমুখি কাষ্ঠাসনে বসে আলাপ করছে— সেইটুকু আলোকিত। সচরাচর সন্ধ্যাকালে প্রয়োজনাতিরিক্ত আলোকোদ্ভাস কৃষ্ণ পছন্দ করেন না, একমাত্র অত্যাবশ্যক কর্মের জন্য ছাড়া। সাত্যকি এখনও অপ্রাপ্তবয়স্ক, কিন্তু এই বিরাট পুরুষের আদর্শ তথা জীবনচর্যা সম্পর্কে সে যথেষ্ট অবহিত। সমগ্র যাদবকুল জানে কৃষ্ণের নীতি। আহারে বিহারে এমনকি প্রহারে সংহারেও দেবকীনন্দন দীর্ঘ কাল সংযম ও অনতিরেক অভ্যাস করে আসছেন। শুধু নিজের জীবনচর্যায় নয়, এই আত্মনিয়ন্ত্রণ তিনি সকলের জন্যই উদাহরণ হিসেবে স্থাপন করতে আগ্রহী।

সাত্যকি সমীহপূর্ণ দৃষ্টিতে বাতায়নলগ্ন কৃষ্ণচ্ছায়ামূর্তিটির দিকে তাকিয়ে থাকে। পুরুষসিংহ বাসুদেব যে তার মতো নগণ্য নাবালককে স্নেহ করেন, মাঝে মাঝে স্বয়ং তাকে নানাবিধ শিক্ষা দেওয়ার জন্য ডাকেন— এ তার সৌভাগ্য ও গর্ব। দ্রোণের আশ্রমে তার অস্ত্রশিক্ষার ব্যবস্থাও কৃষ্ণের পরামর্শেই আয়োজিত, এ কথা সে জানে।

বয়সে নব্য তরুণ— কিন্তু এই বয়সেই যাদব-প্রধান, বীর কৃষ্ণ। শুধু প্রধান অথবা বীর বললে অবশ্য কিছুই বলা হয় না। তিনি একাধারে যদুকুলের বাহু, হৃদয় ও মস্তিষ্ক। সর্বগুণাধার এমন ব্যক্তিত্ব বহু প্রজন্মের মধ্যে এ দেশে অবতীর্ণ হননি। এই যুবা শাস্ত্রজ্ঞানে পণ্ডিত, যুদ্ধবিদ্যায় অপরাজেয়, সৈন্যাপত্যে নিপুণ, কূটনীতিতে সুদক্ষ, রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় অপ্রতিম। যাদবরাজ্যকে বার বার নানা বহিঃশত্রুর হাত থেকে বাঁচিয়েছে তাঁর ক্ষুরধার কূটবুদ্ধি ও বাহুবলের সমন্বয়। আবার ব্যক্তিগত শত্রুতার বশেও যাঁরা তাঁর ক্ষতিসাধন করতে উদ্যোগী হয়েছে, সেই সব অরাতিদেরও আশ্চর্য প্রকৌশলে তিনি দমন করেছেন। অদ্ভুতকর্মা সদ্য-যুবক এই বার্ষ্ণেয়র নানা অতিমানবিক কীর্তি সম্পর্কে এরই মধ্যে আর্যাবর্তের নানা অঞ্চলে জনপ্রবাদ প্রচলিত হয়েছে— তিনি সাধারণ মানুষ নন, ঐশ্বরিক শক্তির অধিকারী, হয়তো বা স্বয়ং দেব-অবতার! রাজা হতে তিনি উৎসাহী নন, কিন্তু তাঁকেই সসম্ভ্রমে নেতা বলে মেনেছে যাদবদের প্রায় সমস্ত গোষ্ঠী। বৃদ্ধ নৃপতি উগ্রসেনও সিংহাসনে উপবেশন ছাড়া আর তেমন স্বাধিকার প্রয়োগ করেন না— নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব গণপরিষদের উপরেই ন্যস্ত। কৃষ্ণই সেই পরিষদের শেষ কথা। কিন্তু সেই আধিপত্যওতিনি বলপূর্বক প্রতিষ্ঠা করেননি। তাঁর নিপুণ যুক্তিজাল, অব্যর্থ মনস্তত্ত্বজ্ঞান ও শান্ত-মধুর বাচনে তিনি সম্পূর্ণ পরিস্থিতি করতলগত করেছেন।

যাদবকুল বংশানুক্রমে অপব্যয়ী, বিলাসী ও অতিভোগী। ধনের অপচয়েও যেমন— তেমনই যৌনসংসর্গে, মদ্যপানে, কথায়-কথায় অস্ত্রব্যবহারে। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই, নিয়ন্ত্রণ বলে কিছু নেই তাদের। এমনকি কৃষ্ণভ্রাতা মহাজ্ঞানী মহাবীর বলরাম পর্যন্ত ক্রুদ্ধ হলে হঠকারী ও ধ্বংসোন্মুখ হয়ে ওঠেন, সুরাপাত্র হাতে পেলে জগৎবিস্মৃত হয়ে পড়েন। স্থিতধী কৃষ্ণ আপ্রাণ পরিশ্রম ও উদ্যোগ নিয়ে চলেছেন এই অমিতাচারী উচ্ছৃঙ্খল যদুবংশীয়দের মিতাচার শেখানোর। কিন্তু বিশেষ সফল হয়েছেন কি? যাদবরা তাঁকে সম্মান করে ঠিকই, কিন্তু নেতার অনুসৃত জীবন-নীতিও নতমস্তকে মান্য করবে এত সুশীলতা তাদের রক্তেই নেই কখনও।

সাত্যকি বাসুদেবের মুখ ফেরানোর অপেক্ষা করে রইল। বেশ বোঝা যাচ্ছে, কৃষ্ণ এখনও অনেক কিছু জানতে চাইবেন। এক পক্ষকাল অন্তর আশ্রমিক অবকাশ মেলে, তখন সাত্যকি হস্তিনা থেকে স্বগৃহে আসে, কৃষ্ণ তার কাছ থেকে নানা বিবরণ সংগ্রহ করেন নিভৃতে। প্রচুর প্রশ্ন থাকে তাঁর— দ্রোণের আশ্রম ও শিক্ষাপদ্ধতি নিয়ে, কুরু-রাজকুমারদের গতিবিধি নিয়ে, এমনকি হস্তিনার রাজপুরুষদের কর্মকাণ্ড নিয়েও। তাঁর মূল আগ্রহ অবশ্য তাঁর পিতৃস্বসা-পুত্রদের বিষয়ে। পঞ্চপাণ্ডব-জননী শৌরসেনী কুন্তী যে কৃষ্ণ-পিতা বসুদেবের নিজ ভগ্নী— এ তথ্য সাত্যকি জেনেছে আশ্রমে যাওয়ার পূর্বাহ্ণেই। তাই, অর্জুনের নৈপুণ্য, ভীমের সামর্থ্য বা যুধিষ্ঠিরের সুবুদ্ধি— সব বিবরণ সাত্যকিকে দিতে হয় নিয়মিত। কৃষ্ণ উপদেশ দিয়েছেন, চক্ষু ও কর্ণ সদা সজাগ রেখে চলার— যাতে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র তথ্যও সযত্নে সংগৃহীত হয়।

কিন্তু, আশ্চর্য! নিজেই সাত্যকিকে বলেছেন বাসুদেব— তাঁর স্বসৃপুত্রদের তিনি এ যাবৎ কখনও চাক্ষুষ করেননি! হিমালয়েই তাদের জন্ম, অনেক কাল সেখানেই তারা যাপন করেছে। কৃষ্ণও নিজের জীবনের উত্তাল ঘটনাবর্তে ব্যতিব্যস্ত থাকার ফলে, তাদের হস্তিনা-প্রত্যাবর্তনের পরবর্তী সময়টুকুতে আর সাক্ষাৎ করতে যেতে পারেননি। কিন্তু এই কুমারদের উত্থান সম্পর্কে তাঁর উৎসাহ-কৌতূহল অপরিসীম। কেন, তা সাত্যকির বোধগম্য হয় না সম্পূর্ণত। শুধু ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দিয়ে সে অনুভব করে, বীর কৌন্তেয়রা কৃষ্ণের কোনও ভবিষ্যৎ-পরিকল্পনার অঙ্গ হতেও পারে হয়তো বা। হয়তো কৃষ্ণের নিজের কাছেও তা এখন অবধি অস্পষ্টতায় আবৃত, তিনি শুধু তথ্যগুলি নিয়ে রাখছেন।

তথ্যাভিজ্ঞতা হল কৃষ্ণের রাজনীতির এক মূল স্তম্ভ, সাত্যকি বেশ উপলব্ধি করে। জম্বুদ্বীপের প্রতিটি রাজ্যে ছড়ানো আছে তাঁর গূঢ়জাল। দক্ষ চরের দল নিত্য বিচরণ করে সর্বত্র। হস্তিনাতেও তারা আছে। কিন্তু নিরাপত্তা-বেষ্টিত আশ্রমের অভ্যন্তরে তারা সম্ভবত মন্ত্রভেদনে অপারগ। তাই কৃষ্ণের এই কূট পদক্ষেপ— একই সঙ্গে সাত্যকির সুশিক্ষা, আর গুপ্ত-সংবাদ আহরণের যৌথ কার্যসিদ্ধি! কী সহজ অথচ কী ব্যতিক্রমী কৌশল! পিতৃগৃহে বয়স্ক যাদবদের আলোচনা শুনেছে সাত্যকি। তাদের ব্যক্তিগত বীরত্ব অতুল হলেও, সংগঠিত সামরিক শক্তি খুব বিপুল নয়। কিন্তু এই যে তথ্য-আহরণের বিস্তারী আয়োজন করে রেখেছেন বাসুদেব— এতে সমগ্র দেশের রাজনৈতিক চালচিত্র সম্পর্কে অন্যদের চেয়ে বহু পূর্বেই অবহিত হয়ে থাকা যায়। ভাবনার দিক থেকে এগিয়ে থাকা যায় কয়েক যোজন। পূর্বপরিকল্পনা নেওয়া যায় সম্ভাব্য পরিস্থিতিগুলির বিচারে। এ বিষয়টিতে কৃষ্ণের পারঙ্গমতা প্রায় অলৌকিক। সাধারণ ঘটনার মধ্যেই অসাধারণ ব্যঞ্জনা লক্ষ করে নিতে পারেন এই অন্তর্দ্রষ্টা কুশাগ্রবুদ্ধি পুরুষ।

আর, এখন সাত্যকি তাঁকে যে বিবরণ দিচ্ছে— সে তো এক বিরল ব্যতিক্রমী কাহিনি! কৃষ্ণকে তা প্রবল ভাবে আঘাত করবে তা প্রত্যাশিত ছিলই।

বাতায়ন থেকে কৃষ্ণ আবার যখন কক্ষের দিকে মুখ ফেরালেন, তখন তাঁর চক্ষু তীক্ষ্ণ, ললাট ভ্রুকুটি-আক্রান্ত। কিছু ক্ষণ আগে, দ্রোণ-একলব্য সংবাদ শোনার সময়ে যে বিস্ময় ও অবিশ্বাসের রেখাগুলি তাঁর মুখে অঙ্কিত হয়েছিল, তার পরিবর্তে এখন গূঢ় অনুসন্ধানী এক সত্তা জাগ্রত হয়ে ওঠার লক্ষণ পরিস্ফুট।

“তুমি সমস্ত ঘটনা একেবারে সামনে থেকেই দেখেছ তো, যুযুধান?” কৃষ্ণ একটু ঝুঁকে পড়েছেন সাত্যকির মুখের কাছে, “আমি বলছি, চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করে বলছ তো? অপরের মুখে শুনে-আসা বিবরণ, বা জনশ্রুতি, কল্পকাহিনি— এমন নয় তো?”

“নির্জলা সত্য বৃত্তান্ত, হে বাসুদেব, স্বচক্ষে দেখেছি, দুই ধনু দূরত্বে দাঁড়িয়ে। এখনও সেই করুণ দৃশ্য আমার রোম শিহরিত করছে, এই দেখুন আর্য!”

“দ্রোণ একেবারে সরাসরি বলে দিলেন, ‘দক্ষিণ হস্তের বৃদ্ধাঙ্গুলিটি দাও?’ নির্দ্বিধায় বললেন?”

“নিষ্কম্প কণ্ঠে! আমি নিজের শ্রবণকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। অন্য কুমাররাও স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল।”

“কিন্তু নিষাদবালক ভীত-বিহ্বল হয়নি, তাই তো বললে তুমি? সে তৎক্ষণাৎ ছুরিকা বার করে...”

“একটি বৃক্ষপত্রের উপর নিজের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ স্থাপন করে সে সেটি কর্তন করে ফেলল! অমানুষিক যন্ত্রণা সে দন্তে দন্ত চেপে ধরে সহ্য করছিল, দেখলাম। অতঃপর, বাম হস্তে সেই পত্রপুট-ধৃত রক্তাক্ত মাংসখণ্ডটি গুরুর দিকে প্রসারিত করে সে বলল, ‘বাম হস্তে গুরুদক্ষিণা দিতে বাধ্য হলাম ভগবন্‌, অপরাধ মার্জনা করবেন...’!”

কৃষ্ণে দ্রুত কয়েকটি শ্বাস ত্যাগ ও গ্রহণ করলেন। যেন ঘ্রাণ নিচ্ছেন, মনে হল সাত্যকির। বাতাসের ঘ্রাণ থেকে যেমন শার্দূল মৃগের গতিপথ চিনে নেয়, তেমনই একাগ্র ও গূঢ়চিন্তিত দেখাচ্ছিল ভ্রূকুটিকুটিল সূক্ষ্মদৃষ্টি বাসুদেবকে।

=========================

        || সাত্যকি= युयुधान,||

মহাভারত বর্ণিত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের একজন প্রধান বীর। যদু বংশীয় সত্যকের পুত্র ও শিনির পৌত্র। ওঁর জন্মদত্ত নাম ছিল যুযুধান। সাত্যকি অর্জুনের কাছে অস্ত্রশিক্ষা করেছিলেন। ভীষ্ম তাকে অধিরথ (শ্রেষ্ঠ শ্রেণীর যোদ্ধা) হিসেবে গণনা করেছিলেন। সাত্যকি ছিলেন কৃষ্ণের অনুগত। পাণ্ডব পক্ষে তিনি যোগ দেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সাত্যকি ভুরিশ্রবার সঙ্গে দ্বৈরথ যুদ্ধে বিপদগ্রস্থ হন। ভুরিশ্রবা যখন সাত্যকির শিরশ্ছেদ করবার জন্য অসি তুলেছেন, তখন অর্জুন ভুরিশ্রবার বাহু দ্বিখণ্ডিত করেন। এই অন্যায় আচরণের জন্য ভুরিশ্রবা অর্জুনকে ভর্ৎসনা করে যখন যোগযুক্ত হয়ে দেহত্যাগ করছেন, তখন সাত্যকি ভুরিশ্রবার শিরশ্ছেদ করেন। যুদ্ধে শাল্বরাজ সাত্যকির হাতে নিহত হয়েছিলেন। ভুরিশ্রবার পিতা সোমদত্তকেও সাত্যকি বধ করেছিলেন। কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের পঁয়ত্রিশ বছর বাদে যখন যদুবংশীয় বীররা পানমত্ত হয়ে পরস্পরের সঙ্গে হানাহানি করছেন, তখন সাত্যকির সঙ্গে কৃতবর্মার বচসা শুরু হয়। নিদ্রিত পাণ্ডব ও পাঞ্চাল বীরদের হত্যাকাণ্ডে কৃতবর্মা অশ্বত্থমার সহকারী ছিলেন বলে সাত্যকি ওঁকে তিরস্কার করেন। কৃতবর্মা সাত্যকির অন্যায় ভাবে ভুরিশ্রবা-বধের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। বচসা চরমে উঠলে সাত্যকি অসি দিয়ে কৃতবর্মার শিরশ্ছেদ করেন। তাই দেখে ভোজ ও অন্ধকবংশীয়গণ সাত্যকিকে আক্রমণ করাতে কৃষ্ণ ও রুক্মিনীর পুত্র প্রদ্যুম্ন সাত্যকিকে রক্ষা করার চেষ্টা করলেন। শেষে দুজনেই নিহত হলেন।

=======================


   "যে তীব্র আবেগে তরুণ ধানুকীকে  নির্দ্বিধায় নিজ আঙ্গুলি গুরু-পদে দান করতে রাড়িত করেছিল----সেই আবেগেই এক বিপ্রতীপ রূপ, আজ জ্বলন্ত 

প্রতিবিধিৎসা হয়ে নিরন্তর দগ্ধ করছে তাকে। শ্রদ্ধা-প্রেম-উৎসর্গের চেতনা যখন নিষ্ঠুর প্রতারণার শিকার হয়, তখন সেই চিতাবহ্নি থেকেই জেগে ওঠে প্রেত---

যার নাম ঘৃণা! তার মুষ্টিতে জিঘাংসা--খড়গ, তার স্কন্ধের তুনীরে শপথ-বাণ, তার আকন্ঠ প্রতিশোধ-পিপাসা । সেই তৃষা- নিবৃত্তির জন্য সে করতে পারেনা এমন কর্ম বিশ্বে নেই।"


প্রতিবিধিৎসা==প্রতিবিধানের ইচ্ছা।





Wednesday, July 6, 2022

33>|| সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস= আইনস্টাইন----||

   33>|| সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস----||

আইনস্টাইনের  ড্রাইভার একদিন  আইনস্টাইনকে বললেন

"স্যার - আপনি প্রতিটি সভায় যে ভাষণ দেন সেইগুলো শুনে শুনে আমার মুখস্থ হয়ে গেছে ।"

-আইনস্টাইন  এ কথা শুনে তো অবাক!

তখন আইনস্টাইন বললেন "বেশ  বেশ তাহলে এর পরের মীটিংয়ে যেখানে যাবো তারা আমাকে চেনেন না, তুমি আমার হয়ে ভাষণ দিও আর আমি ড্রাইভার হয়ে বসে থাকবো ।"

ড্রাইভার এক কথায় রাজি এবং-এর পরের  সভায়  ড্রাইভার হুবহু আইনস্টাইন-এর ভাষণ গড় গড় করে বলে গেলেন । উপস্থিত বিদ্বজ্জনেরা তুমুল করতালি দিলেন । এরপর তাঁরা ড্রাইভারকে আইনস্টাইন ভেবে গাড়িতে পৌঁছে দিতে এলেন ।

-সেই সময়ে একজন অধ্যাপক ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেন "স্যার, ঐ আপেক্ষিক এর যে সঙ্গাটা বললেন, আর একবার সংক্ষেপে বুঝিয়ে দেবেন ?"

-আসল আইনস্টাইন দেখলেন বিপদ, এবার তো ড্রাইভার ধরা পড়ে যাবে । কিন্তু তিনি ড্রাইভার-এর উত্তর শুনে তাজ্জব হয়ে গেলেন । 

ড্রাইভার উত্তর দিল। আরে-"এই সহজ জিনিসটা আপনার মাথায় ঢোকেনি ? আমার ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করুন সে বুঝিয়ে দেবে ।"

বিঃদ্রঃ- জ্ঞানী ব্যক্তিদের সাথে চলাফেরা করলে আপনিও জ্ঞানী হবেন। আপনি যেমন মানুষের সাথে ঘুরবেন তেমনই হবেন। এই জন্যে কথায় আছে, "সৎ সঙ্গে স্বর্গ বাস অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ"

            " সংগৃহীত"।

   <----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->

==========================

Sunday, June 12, 2022

32>||অস্ত্র-অনুশীলনে শিক্ষা----ধনুর্বেদ

 

 

         32>||অস্ত্র-অনুশীলনে শিক্ষা--------


||  অস্ত্র ও শস্ত্র::+-ধনুর্বেদ’||

শস্ত্র হল সেই সব প্রহরণ যা হাতে ধরে রেখে সম্মুখযুদ্ধ করা হয়, যা নিক্ষেপযোগ্য নয়। নিক্ষেপযোগ্য আয়ুধ, যেমন বিভিন্ন গোত্রের বাণ, ভল্ল, শূল, শক্তি, তোমর, চক্র ইত্যাদিকে সমরবিদ্যা অনুযায়ী বলা হয় অস্ত্র। 

অস্ত্রধারী দূর থেকে আঘাত হানতে সক্ষম, সরাসরি দৈহিক নৈকট্যে আসার প্রয়োজন পড়ে না। তাই খুব বেশি বক্তৃতার অভ্যাসও অনাবশ্যক। 

কিন্তু তরবারি, খড়্গ, ছুরিকা, গদা, কুঠার এই সব শস্ত্র-চালনা হয় প্রতিপক্ষের একেবারে প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসে। তাই, এ ক্ষেত্রে শারীরিক শক্তি ও সহনক্ষমতাও যেমন অধিক থাকা চাই, তেমন প্রয়োজন অতিরিক্ত মানসিক তেজ। নিজেকে উদ্বুদ্ধ রাখা ও প্রতিপক্ষকে মানসিক চাপে ফেলা— দুয়ের জন্যই শস্ত্রধারীদের বাগাড়ম্বরপূর্ণ আত্মপ্রশস্তি এবং হুঙ্কার

-প্রতিহুঙ্কারের শিক্ষাও দেওয়া হয়।

তির-নিক্ষেপের বিদ্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হল পবন-গতি-জ্ঞান। বায়ুর বেগ, অভিমুখ ও উত্থান-নমনের স্পষ্ট ধারণা এবং সেই তিনটি বিষয়কে নিজের শরক্ষেপণের অনুকূলে প্রয়োগ; সেই প্রয়োগ-জ্ঞান অনুযায়ী সেই মুহূর্তের উপযুক্ত নির্মাণ-ভারসাম্যবিশিষ্ট বাণ নির্বাচন করা; কখন লঘু-মস্তক বাণ, কখন গুরু-মস্তক, কখন দীর্ঘ, কখন নাতিহ্রস্ব। বায়ু-গতি-বিজ্ঞান মেনে নির্দিষ্ট-সংখ্যক পক্ষিপুচ্ছ সংযুক্ত থাকে বিভিন্ন তিরের পশ্চাদ্ভাগে, তাতেও আছে প্রযুক্তির গণিত, স্মরণ রাখতে হয় তা-ও। সর্বোপরি সমস্তটাই হতে হবে তাৎক্ষণিক, মৌহূর্তিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।

একই সঙ্গে শ্যেনদৃষ্টি, উপস্থিত বুদ্ধি, শীতল মস্তিষ্ক, অনুশীলন-অভিজ্ঞতা ও প্রাযুক্তিক জ্ঞান— এই পঞ্চগুণের চূড়ান্ত মাত্রা প্রয়োজন শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হতে গেলে। অন্য কোনও অস্ত্র বা শস্ত্রের বিদ্যা এতগুলি গুণ দাবি করে না, এত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব জানার আবশ্যক হয় না। তাই, একমাত্র এই অস্ত্রবিদ্যাকেই বেদের তুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, ‘ধনুর্বেদ’ নামটি সেই মহিমারই দ্যোতক।

 =============================

 অস্ত্র ও  শস্ত্র ::----

অস্ত্র ::----সমরবিদ্যা অনুযায়ী অস্ত্র বলা হয় নিক্ষেপযোগ্য আয়ুধ, যেমন বিভিন্ন গোত্রের বাণ, ভল্ল, শূল,  শক্তি, তোমর, চক্র ইত্যাদিকে।   

অস্ত্রধারী দূর থেকে আঘাত হানতে সক্ষম, সরাসরি দৈহিক নৈকট্যে আসার প্রয়োজন পড়ে না। তাই খুব বেশি বক্তৃতার অভ্যাসও অনাবশ্যক।

শস্ত্র ::----সমরবিদ্যা অনুযায়ী শস্ত্র হল নিক্ষেপযোগ্য নয় এমন  সব প্রহরণ, যেমন  তরবারি, খড়্গ,                          ছুরিকা, গদা, কুঠার   ইত্যাদি।  

         শস্ত্রধারী প্রতিপক্ষের একেবারে প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এসে, যা হাতে ধরে রেখে সম্মুখযুদ্ধ  করা হয়  তাই, এ ক্ষেত্রে শারীরিক শক্তি ও সহনক্ষমতাও যেমন অধিক থাকা চাই, তেমন প্রয়োজন অতিরিক্ত মানসিক তেজ। নিজেকে উদ্বুদ্ধ রাখা ও প্রতিপক্ষকে মানসিক চাপে ফেলা— দুয়ের জন্যই শস্ত্রধারীদের বাগাড়ম্বরপূর্ণ আত্মপ্রশস্তি এবং হুঙ্কার-প্রতিহুঙ্কারের শিক্ষাও দেওয়া হয়।

 শস্ত্র ::-- শস্ত্র হাতে ধরে রেখে যুদ্ধ করতে হয়।

অস্ত্র::- অস্ত্র নিক্ষেপযোগ্য আয়ুধ।



তির-নিক্ষেপের বিদ্যাকে ‘ধনুর্বেদ’ বলা হয় কেন ??-------

তির-নিক্ষেপের বিদ্যায় অতি গুরুত্বপূর্ণ হল পবন-গতি-জ্ঞান। বায়ুর বেগ, অভিমুখ ও উত্থান-নমনের স্পষ্ট ধারণা এবং সেই তিনটি বিষয়কে নিজের শরক্ষেপণের অনুকূলে প্রয়োগ; সেই প্রয়োগ-জ্ঞান অনুযায়ী সেই মুহূর্তের উপযুক্ত নির্মাণ-ভারসাম্যবিশিষ্ট বাণ নির্বাচন করা; কখন লঘু-মস্তক বাণ, কখন গুরু-মস্তক, কখন দীর্ঘ, কখন নাতিহ্রস্ব। বায়ু-গতি-বিজ্ঞান মেনে নির্দিষ্ট-সংখ্যক পক্ষিপুচ্ছ সংযুক্ত থাকে বিভিন্ন তিরের পশ্চাদ্ভাগে, তাতেও আছে প্রযুক্তির গণিত, স্মরণ রাখতে হয় তা-ও। সর্বোপরি সমস্তটাই হতে হবে তাৎক্ষণিক, মৌহূর্তিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।

একই সঙ্গে শ্যেনদৃষ্টি, উপস্থিত বুদ্ধি, শীতল মস্তিষ্ক, অনুশীলন-অভিজ্ঞতা ও প্রাযুক্তিক জ্ঞান— এই পঞ্চগুণের চূড়ান্ত মাত্রা প্রয়োজন শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হতে গেলে। অন্য কোনও অস্ত্র বা শস্ত্রের বিদ্যা এতগুলি গুণ দাবি করে না, এত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব জানার আবশ্যক হয় না। তাই, একমাত্র এই ধনুর্বিদ্যাকেই বেদের তুল্য মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, ‘ধনুর্বেদ’ নামটি সেই মহিমারই দ্যোতক।



দ্রোণ খুব তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তার পরবর্তী ক্রিয়াটুকু দেখলেন। বস্তুত, এই দ্বিতীয় ধাপটি কী ভাবে সম্পন্ন করছে ধানুকী— সেটিই তার নৈপুণ্যের অগ্নিপরীক্ষা। একযোগে একাধিক তির শরাসনে স্থাপন করাই যথেষ্ট দুরূহ। তার পর, একটি শর ক্ষেপণের সঙ্গে সঙ্গে ভিন্ন অভিমুখে দ্বিতীয় শর! অতি কঠিন কাজ। প্রথমত, পূর্ববর্তী ক্ষেপণটির অভিঘাতে জ্যা তখনও কম্পমান, ফলে শরস্থাপন করাই সমস্যাজনক। দ্বিতীয়ত, অত স্বল্প সময়ে সম্পূর্ণ বিপরীত অভিমুখে বাণ চালানো; বায়ুর ঝোঁক বুঝতেই নাভিশ্বাস উঠবে।

গভীর মনোনিবেশ সহকারে প্রিয় ছাত্রের কার্য দেখলেন দ্রোণ। এবং দেখে অভিভূত হলেন। এই কুমারের দক্ষতা বাস্তবিকই সহজাত। এর অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলি অসম্ভব নমনীয় কিন্তু বলবান। ভীষ্মকে পরামর্শ দিয়ে গুরু দ্রোণ যে এই কুমারের জন্য রাজপুরীতে স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনায় নৃত্য-শিক্ষক এবং যোগব্যায়াম-শিক্ষক নিযুক্ত করেছেন, তার সুফল ফলেছে। সাধারণত কোনও রাজপুত্রকে নৃত্যকলা শেখাতে গেলে পৌরুষ-মদবশত সে তা প্রত্যাখ্যান বা অবহেলা করে, তা-ই স্বাভাবিক। কিন্তু আদর্শ ছাত্র অর্জুন যে কোনও শিক্ষার বিষয়েই শতভাগ আগ্রহী। নৃত্যশিক্ষাতেও পরম সঙ্কোচহীন, অলজ্জ ও উৎকর্ষকামী সে। দ্রোণ লক্ষ করেছেন, নৃত্যাভ্যাসের গুণেই অর্জুনের করতল ও অঙ্গুলির মুদ্রাগুলি অতি নমনীয় ও লঘুসঞ্চালনক্ষম হয়েছে। বিদ্যুদ্বেগে নড়াচড়া করে তার বাহু ও মুষ্টির সমস্ত অস্থিসন্ধি। স্কন্ধ-বক্ষ-গ্রীবা-কটি— সমস্ত পেশি সাধারণ লোকের তুলনায় ত্রিগুণ প্রাণময়— প্রয়োজনে স্তম্ভের মতো সুস্থিত, প্রয়োজনে প্রপাতের মতো সচল। নৈঋেতর তালবৃক্ষটির দিকে সে যে গতিতে ঘুরে দাঁড়াল, যে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ও দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বায়ুর গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করল এবং মরুৎ-বিজ্ঞানকে সম্পূর্ণ কাজে লাগিয়ে চকিতে নিক্ষেপ করল দ্বিতীয় বাণটি— তা শ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদ হওয়ার সমস্ত সুলক্ষণে প্রোজ্জ্বল।

একটিই প্রশ্ন করার ছিল দ্রোণের। তিনি কিশোরের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিন্তু, পার্থ, জম্বুবৃক্ষে তুমি যে উচ্চতায় তির বিদ্ধ করলে, ভূমি থেকে প্রায় তিন হাত ঊর্ধ্বে— তালবৃক্ষে সেই সমতা কিন্তু রক্ষা করতে পারোনি। তালবৃক্ষে তোমার শরটি বড় নীচে বিদ্ধ হল যে, ভূমি থেকে মাত্র এক হাত! এই ত্রুটির কারণ?”

“ত্রুটি নয় তো, আচার্যদেব!” অর্জুন ঈষৎ সহাস্যমুখে কিন্তু অকম্প্র কণ্ঠে উত্তর দিল, “জম্বুবৃক্ষটিকে তো ঋক্ষ কল্পনা করতে বলেছিলেন। তার মর্মস্থল বিদ্ধ করতে তো বাণ মাটি থেকে ওই পরিমাণ উপরেই স্থির করা চাই! কিন্তু তালবৃক্ষ তো বরাহ— তাকে বধ করতে হলে...”

দ্রোণ বিস্ময়ে-আনন্দে বিহ্বল হলেন ক্ষণকাল। এখনও অপ্রাপ্তবয়স্ক, এখনও শিক্ষা সম্পূর্ণ নয়— কিন্তু ধনুর্বাণের এই অসামান্য কৃৎকৌশলটি চোখের পলকে সম্পন্ন করার সময়, ওই দুই মুহূর্তের মধ্যেও, এত বিপুল বাস্তববাদী ভাবনার উদ্ভাস ঘটাতে পেরেছে সে তার মস্তিষ্কের কোষে! এমন শিষ্য প্রকৃতই কোটিতে এক মেলে। এ কী অলোকসামান্য প্রতিভা নিয়ে এসেছে পাণ্ডুর তৃতীয় সন্তান!

আচার্যের শুষ্ক চক্ষু আর্দ্র হল। সমস্ত শিক্ষার্থীর সমক্ষেই তিনি আলিঙ্গন করলেন অর্জুনকে, গদগদকণ্ঠে বললেন, “পুত্র! তোমাকে আমি বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ ধনুর্বিদে পরিণত করব, এই কথা দিলাম! তোমার জয়ের পথ নিষ্কণ্টক হোক! এখনই তোমার তুল্য প্রতিভাশালী সমগ্র পৃথিবীতে কেউ নেই, এ আমি নিশ্চিত বললাম।”

“কেউ নেই? সত্যিই, গুরুদেব— আমার সমান কেউ নেই?” যেন গুরুর কানে কানে অস্ফুটে বলে আলিঙ্গনাবদ্ধ অর্জুন। পরম স্বীকৃতিটির বিষয়ে নিঃসংশয় হতে চায়।

প্রথম থেকেই দ্রোণ দেখেছেন, প্রশংসা শুনলে এই বালক তীব্র ভাবে উদ্বুদ্ধ হয়। তার পরবর্তী কাজগুলি আরও কৃতিত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, আরও নিবিড় অনুশীলন-মনোযোগ-পরিশ্রমে নিমজ্জিত করে দেয় নিজেকে। ‘আমি শ্রেষ্ঠ’— এই শব্দগুলি তার কাছে মাদক উত্তেজনার রসায়ন জোগায়।

এই কারণেই, কেবল এই শিক্ষার্থীকে নিরঙ্কুশ শ্রেষ্ঠত্ব দানের জন্যই, নিজ আত্মজ অশ্বত্থামাকেও আজকাল গূঢ় বিদ্যা দেওয়া বন্ধ করেছেন দ্রোণ। অশ্বত্থামা তত বড় আধার নয়, পিতা হয়ে তিনি জানেন। পিতৃ-প্রশ্রয়ে কিছু উৎকৃষ্ট বিদ্যা সে অধিগত করেছে ঠিকই, কিন্তু ওই পর্যন্তই তার সীমা। উত্তুঙ্গতম গ্রহণক্ষমতা বা প্রয়োগ-পারদর্শিতার প্রতিভা নেই কৃপী-নন্দনের। থাক তবে, একটি শাখাতেই ফলবতী হোক সমস্ত শ্রেষ্ঠ মেধাসম্পদ!

মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসও সে দিন আশ্রম-দর্শনে এসে এই একই প্রশ্ন করেছিলেন— আচার্যের কোন শিষ্য সর্বাধিক প্রতিশ্রুতি বহন করছে, কে হবে ভবিষ্যৎ ভারতের শ্রেষ্ঠ মহাযোদ্ধা?

দ্রোণ শুনেছেন, ভরতবংশের সমগ্র কাহিনি নিয়ে বেদব্যাস এক মহাকাব্য রচনার উদ্যোগ নিয়েছেন, যা তাঁর শিষ্যদের মুখে-মুখে সারা জম্বুদ্বীপে প্রচারিত হবে। সব দিকে ব্যাসদেবের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। চতুর্দিকে তাঁর তথ্য-আহরণের মহতী প্রক্রিয়া চলমান। কুরু-বংশধরদের বিকাশ ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কেও তিনি সজাগ। বর্তমান কুরুকুমাররা আবার দ্বৈপায়নের প্রত্যক্ষ পৌত্রও বটে, তাই তৃতীয় পাণ্ডবের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়ে তিনি গ্রন্থে বিশেষ উল্লেখ রাখবেন স্বাভাবিক ভাবেই। দ্রোণ তাঁকে তা নিয়ে নিশ্চিত আশ্বাস দিয়েছেন।

“আমার সমান কেউ নেই, না আচার্য?” এখন জানতে চাইছে ব্যাস-পৌত্র অর্জুন নিজেও।

নিজের মাথাটি দুই দিকে সঞ্চালন করে ‘না বৎস’ বলতে গিয়েও এক মুহূর্ত অন্যমনস্ক হয়ে পড়েন দ্রোণ, স্তব্ধ ও নিরুত্তর।

আচম্বিতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক কাতর অথচ ক্রুদ্ধ তরুণের মুখচ্ছবি! প্রিয়দর্শন সুগৌর আনন ক্ষোভে আরক্তিম, কণ্ঠে যুগপৎ অসহায়তা ও প্রতিবাদ...

“আপনি অর্জুনের প্রতি এমন প্রকট পক্ষপাতী, আচার্য! ছি! আপনি না গুরু, আপনার না নিরপেক্ষ হওয়ার কথা! তার পরিবর্তে আপনি এমন শঠতা করেন শিষ্যদের সঙ্গে!”

নির্জন মধ্যাহ্নে, সবাই যখন বিশ্রামরত— সে এসে দাঁড়িয়েছিল অভিযোগের উদ্যত অঙ্গুলি নিয়ে। দ্রোণ অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলেছিলেন, “কী বলতে চাও তুমি, রাধেয়! এত বড় অসম্মানের উক্তির স্পর্ধা...”

“নিজ সম্মান তো আপনি স্বয়ং মলিন করে চলেছেন, আচার্য! দিনের পর দিন!” সূত অধিরথের পুত্রটি তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে যেন ভর্ৎসনাই করছিল গুরুকে, “নিরালা ধাতুশালায় আপনি কেবলমাত্র অর্জুনকে ডেকে নিয়ে আপনার গূঢ়বিদ্যা দান করেন। অন্য সকলকে ছল করে ক্রীড়া-বিলাসে মগ্ন করে রাখেন। কেন, প্রভু, অন্য ধনুর্ধররা কি কৌন্তেয়র সতীর্থ নয়, আপনার শিষ্য নয়? আশ্রমে যা-যা শিক্ষা দেওয়া হবে— ধর্মত ও ন্যায়ত প্রত্যেকেই কি তা পাওয়ার অধিকারী নয়? ...আপনার ছল অনুধাবন করে, আমি কয়েকদিন আপনার আহ্বান ব্যতিরেকেই কর্মশালায় প্রবেশ করেছিলাম— কিন্তু সেখানেও আপনি কপটাচরণ শুরু করলেন। গোপন পাঠ দেওয়ার প্রারম্ভেই আমার হাতে আপনি একটি মৃৎকলস ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “যাও রাধেয়, রাজপথিপার্শ্বের গভীর কূপ থেকে সুপেয় জল নিয়ে এসো!” কখনও বা অসুস্থ গুরুপত্নীর জন্য বৈদ্যগৃহ থেকে ঔষধ আনা, কখনও গাভীর বৎসটিকে গোশালায় বেঁধে রেখে আসা— ইত্যাদি তাবৎ আদেশ পালনের জন্য একমাত্র আমাকেই নির্বাচন করতেন আপনি— এবং ওই মোক্ষম লগ্নটিতেই, আগেও নয়, পরেও নয়! আপনিও বেশ জানেন, আচার্য, আপনি আমার সঙ্গে যা করে চলেছেন তার নাম প্রবঞ্চনা!”

“অর্জুন রাজপুত্র। হস্তিনার কুমার সে। আর আমি... হস্তিনার বেতনভুক শিক্ষক,” দ্রোণ গম্ভীর কিন্তু অনুচ্চস্বরে বলেছিলেন, “অন্নদাতাকে বিশেষ পক্ষপাত দেখানোয় কোনও অধর্ম নেই, অন্নদাতার জন্য প্রাণ অবধি দেওয়া যায়, স্বতন্ত্র বিদ্যাদান তো তুচ্ছ বিষয়! আর শোনো, বসুষেণ! হস্তিনার কুমারের সঙ্গে সূতপুত্রের তুলনা হয় না, জেনো! সমাজে যে-ভেদ প্রচলিত আছে, শাস্ত্রে যে-বর্ণাশ্রম আছে— একটি ক্ষুদ্র শিক্ষাসত্র তার বিপরীত কিছু অনুমোদন করবে, এই প্রত্যাশাই তোমার ভুল। তোমাকে আশ্রমের অন্তর্ভুক্ত করাই আমার অভিপ্রেত ছিল না— তোমার পিতার প্রভাবে তুমি অপ্রাপ্যের স্বাদ পেয়েছ অনেকটাই। এর অধিক পাবে না এখানে। আমি জানি, তুমি অর্জুনকে ঈর্ষা করো। এমনকি, ব্রহ্মাস্ত্রের জ্ঞান চাও, সেও তার প্রতিস্পর্ধী হওয়ার মানসেই! কিন্তু সে তো তোমার অপ্রাপ্য হে সূতনন্দন— এও তোমার জ্ঞাত থাকা উচিত ছিল!”

হেসেছিল অধিরথ-পুত্র, তিক্ত হাস্য। সক্ষোভে ও সশ্লেষে বলেছিল, “সে আমি অনেক পূর্বেই উপলব্ধি করেছি, গুরুশ্রেষ্ঠ! এও জানি, যে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নষ্ট হয়েছে তাঁর কাছে অধ্যয়ন নিরর্থক। আমি আজই শেষ বারের মতো এই আশ্রম-উদ্যানে পদপাত করলাম। আমি অন্য গুরুর সন্ধানে যাব। জন্ম দৈবাধীন, কিন্তু পুরুষকার আমার আয়ত্ত— আমি নিজ ভাগ্য নিজে নির্মাণে সক্ষম!”

দ্রোণ শুধু বলেছিলেন, “কল্যাণ হোক!”

রাধেয় তাঁকে প্রণাম করেছিল। তার পর বলেছিল, “বিদায়ের আগে একটি প্রশ্নের উত্তর যাচ্ঞা করি হে ভারদ্বাজ!”

“কী?”

“আপনি আমাকেও গভীর ভাবে নিরীক্ষণ করেছেন, আমি জানি। সত্য বলুন, ধনুর্বেদে আমার দক্ষতা কি অর্জুনের চেয়ে কিছু কম বলে আপনার ধারণা? দৃষ্টি বুদ্ধি ধৈর্য মনঃসংযোগ অনুশীলন— এর কোনওটিতেই কি কৌন্তেয় অর্জুন বাস্তবে এই রাধেয়র চেয়ে উৎকৃষ্টতর? যদি আপনি আমাকে তার মতোই স্নেহ ও যত্ন নিয়ে অপক্ষপাতে শিক্ষা দিতেন, যদি ওই ভাবেই নিয়মিত দিতেন গূঢ়তম বিদ্যাগুলি, তবে আমিই কি হতাম না শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর?”

দ্রোণ মৌন ছিলেন কিছু ক্ষণ। তাঁর দৃষ্টি নমিত হয়েছিল আপনা থেকেই, খুব ধীরে ধীরে শুধু বলেছিলেন, “তোমার নতুন আচার্য হয়তো এ বিষয়ে চূড়ান্ত মীমাংসার পথে তোমাকে চালনা করবেন!”

আজ অর্জুনের প্রশ্ন শুনে চকিতে রাধেয়র সেই শাণিত প্রশ্ন মনে পড়ে গেল। পার্থ জানতে চাইছে, ‘আমার সমান কেউ নেই?’ রাধেয়রও জিজ্ঞাসা ছিল, ‘আমার দক্ষতা কি অর্জুনের চেয়ে কিছু কম?’

কুরু-অন্নজীবী দরিদ্র ব্রাহ্মণ দ্রোণ আর অস্ত্রগুরু আচার্য দ্রোণ মুখোমুখি, দু’জনেই নীরব।

মহাগ্রন্থ-লিখনরত বেদব্যাসকেও রাধেয়র বিষয়ে কিছু অবগত করেননি দ্রোণ। কিন্তু ঋষি নাকি সর্বজ্ঞ, অন্তর্দ্রষ্টা... তিনি কি একেবারেই কিছু জানতে পারবেন না?

ক্রমশ

======================

Wednesday, November 24, 2021

31>||মা"সর্বশক্তিময়ী "মা"

 31>||"মা"সর্বশক্তিময়ী "মা"🔱*


শাক্তেরা জগতের সেই  সর্বব্যাপিনী শক্তিকে "মা" ব’লে পূজা ক’রে থাকেন,

কারণ মা-নামের চেয়ে মিষ্ট নাম আর নাই। প্রেমের উচ্চতম বিকাশরূপে পূজা করাকে হিন্দুরা ‘দক্ষিণাচার’ বা ‘দক্ষিণমার্গ’ বলেন, ঐ উপাসনায় আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতি হয়, মুক্তি হয়—এর দ্বারা কখনও ঐহিক উন্নতি হয় না।  আর "মা"এর ভীষণ রূপের, রুদ্রমূর্তির উপাসনাকে ‘বামাচার’ বা  ‘বামমার্গ’ বলে; সাধারণতঃ এতে সাংসারিক উন্নতি খুব হ’য়ে থাকে, কিন্তু আধ্যাত্মিক উন্নতি বড় একটা হয় না। কালে ঐ থেকে অবনতি এসে থাকে, আর যারা ঐ সাধন করে, সেই জাতির একেবারে ধ্বংস হ’য়ে যায়। জননীই শক্তির প্রথম বিকাশ-স্বরূপ, আর "জনকের" ধারণা থেকে "জননীর" ধারণা ভারতে উচ্চতর বিবেচিত হ’য়ে থাকে। "মা"-নাম করলেই শক্তির ভাব সর্বশক্তিমত্তা, ঐশ্বরিক শক্তির ভাব এসে থাকে, শিশু যেমন নিজের মাকে সর্বশক্তিময়ী মনে ক’রে ভাবে—"মা" সব করতে পারে। সেই জগজ্জননী ভগবতীই আমাদের অভ্যন্তরে নিদ্রিতা কুণ্ডলিনী—তাঁকে উপাসনা না ক’রে আমরা কখনই নিজেদের জানতে পারি না। সর্বশক্তিমত্তা, সর্বব্যাপিতা ও অনন্ত দয়া সেই জগজ্জননী ভগবতীর গুণ।  জগতে যত শক্তি আছে, তিনিই তার সমষ্টিরূপিণী। জগতে যত শক্তির বিকাশ দেখা দেয়, সবই সেই "মা"। তিনিই প্রাণরূপিণী, তিনিই বুদ্ধিরূপিণী, তিনিই প্রেমরূপিণী। তিনি সমগ্র জগতের ভিতর রয়েছেন, আবার জগৎ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক্‌। তিনি একজন ব্যক্তি, তাঁকে জানা যেতে পারে এবং দেখা যেতে পারে  (যেমন ঠাকুর রামকৃষ্ণ তাঁকে জেনেছিলেন ও দেখেছিলেন)। 

সেই জগন্মাতার ভাবে প্রতিষ্ঠিত হ’য়ে আমরা যা খুশি তাই করতে পারি। তিনি অতি সত্ত্বর আমাদের প্রার্থনার উত্তর দিয়ে থাকেন। তিনি যখন ইচ্ছা যে কোনরূপে আমাদের দেখা দিতে পারেন। সেই জগজ্জননীর নাম ও রূপ দুই-ই থাকতে পারে, অথবা রূপ না থেকে শুধু নাম থাকতে পারে। তাঁকে এই-সকল বিভিন্ন ভাবে উপাসনা করতে করতে আমরা এমন এক অবস্থায় উপনীত হই, যেখানে নাম রূপ কিছুই নেই, কেবল শুদ্ধসত্তামাত্র বিরাজিত। যেমন কোন শরীরবিশেষের সমুদয় কোষগুলি (cells) মিলে একটি মানুষ হয়, সেইরূপ  প্রত্যেক জীবাত্মা যেন এক একটি কোষস্বরূপ, এবং তাদের সমষ্টি ঈশ্বর আর সেই অনন্ত পূর্ণ তত্ত্ব (ব্রহ্ম) তারও অতীত। সমুদ্র যখন স্থির থাকে তখন তাকে বলা যায় ‘ব্রহ্ম’, আর সেই সমুদ্রে যখন তরঙ্গ ওঠে তখন তাকেই আমরা ‘শক্তি’ বা 'মা’ বলি। সেই শক্তি বা মহামায়াই দেশকাল নিমিত্ত স্বরূপ। সেই ব্রহ্মই মা। তাঁর দুই রূপ একটি সবিশেষ বা সগুণ, এবং অপরটি নির্বিশেষ বা নির্গুণ। প্রথমোক্ত রূপে তিনি ঈশ্বর, জীব ও জগৎ; দ্বিতীয় রূপে তিনি অজ্ঞাত ও অজ্ঞেয়। সেই নিবুপাধিক সত্তা থেকেই ঈশ্বর, জীব ও জগৎ এই ত্রিত্বভাব এসেছে।

 ============

*তথ্যসূত্রঃ  স্বামী বিবেকানন্দের ‘দেববাণী’ থেকে গৃহীত*

           ( সংগৃহীত)

        <---আদ্যনাথ--->

==========================

30>|| যেদিন মা সূক্ষ্ম দেহ লাভ করলেন ।।

 30> ||যেদিন মা সূক্ষ্ম দেহ লাভ করলেন  ||


শরীর যাবার আগের দিন সকাল থেকেই মায়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। আমার আবার তার আগের দিন পেট খুব খারাপ হওয়াতে শরীর এত দুর্বল যে নড়বার শক্তি নেই। মহারাজ (শরৎ) আমাকে তাঁর ঘরে বসেই মাছের ঝোলভাত খেয়ে নিতে বললেন। 

এদিকে মার  শ্বাসকষ্ট এত বাড়ছে যে তাঁর সে কষ্ট যেন চোখে দেখা যায় না। একতলা থেকে তিনতলা - সারাবাড়ি সেই শব্দ শোনা যাচ্ছে। চোখদুটি যেন বেরিয়ে আসছে। মা তো কোনও বাছবিচার করেন নি। যত পাপীতাপীকে বুকে নিয়েছেন বলে তাঁর এই কষ্ট! সাধুভক্তে বাড়ী ভরে গেল। 

সারারাত্রি আমি আর সুধীরাদি মায়ের পায়ের কাছটিতে বসেছিলুম। যোগীনমা আমাকে একঘটি জলে মায়ের পায়ের কাছটিতে আঙুল ডুবিয়ে চরণামৃত করে নিতে বললেন। শ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের মুখে ফোঁটা ফোঁটা গঙ্গাজল দিতে লাগলুম। ধীরে ধীরে শব্দ কমে আসতে লাগল, ক্রমে সব শান্ত। তখন রাত একটা বেজে গেছে। সেদিন চৌঠা শ্রাবণ (১৩২৭)।

যে মায়ের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না, এখন সেই মায়ের রূপ আর ধরছে না - একেবারে দুর্গাপ্রতিমার মতো!

মাকে সরু লালপেড়ে গরদের কাপড় পরিয়ে দেওয়া হলো। পরদিন বেলা এগারটায় মায়ের খাট মাথায় করে কাশীপুর হয়ে বরানগর কুঠিঘাট অবধি নিয়ে আসা হলো। আমাকে গোলাপ-মা, যোগীন-মা সঙ্গে যেতে বারণ করেছিলেন। সুধীরাদি জোর করে আমার হাত ধরে বের করে নিয়ে এলেন। তখন খুব ভগবানের নাম, হরি-সঙ্কীর্তন হচ্ছে। ওদের সঙ্গে সঙ্গে কুঠিঘাট পর্যন্ত গেলুম। সেখান থেকে মহারাজেরা ও ভক্তেরা মাকে নিয়ে একটা বড় নৌকায় উঠলেন। আমরা মেয়েরা পাশে পাশে একটা ছোট নৌকায়।

বেলা দুটোয় বেলুড়ের ঘাটে পৌঁছে মাকে আমতলায় নিয়ে যাওয়া হলো। তারপর সেখানে পূজা ও ভোগ নিবেদন। পরে গঙ্গার ঘাটে মাকে স্নান করানো হবে। কাপড় দিয়ে আড়াল করা হলো। আমি আর সুধীরা-দি মায়ের শরীর তুলে নিয়ে গঙ্গার জলে রেখে তাঁকে স্নান করালুম। ইদানীং অসহ্য গায়ের জ্বালায় মা প্রায়ই বলতেন, "গঙ্গায় নিয়ে চল, গঙ্গায় নিয়ে চল।" তখন মায়ের শরীর যে কী হালকা ও নরম লাগছিল।

ঐ কাপড়খানা বদল করে তাঁকে আর একটা নতুন সরু লালপেড়ে গরদ পরানো হলো। এবার সাধুরা তাঁকে আবার আমতলায় নিয়ে গেলেন। সেখানে দ্বিতীয়বার মাকে আরতি করা হয়। আমি সব দেখলুম, মনে কিছুই হলো না। তারপর যেখানে বর্তমানে মায়ের মন্দির সেখানে চিতা সাজানো হলো। আমি আর সে দৃশ্য দেখতে পারছি না, কী দেখব? সুধীরা-দির পিছনটিতে শুয়ে পড়লুম। 

চন্দনকাঠের চিতায় মাকে শুইয়ে দিয়ে শরৎ মহারাজ ও অন্যসব মহারাজরা বেলপাতা, ধুনো ও গুগগুল প্রদক্ষিণ করে করে আহুতি দিতে লাগলেন।

প্রবোধ-দি জোর করে আমার হাত ধরে টেনে তুলে বললেন, "একবার দেখ না কী সুন্দর দেখাচ্ছে!" দেখলুম আগুনের শিখা আকাশ ছুঁয়ে কত উঁচুতে উঠেছে। তখন তো এখনকার মতো ট্রাম-বাসের সুবিধা ছিল না, তাই খুব বেশী ভিড় হয়নি। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ওপারে তখন বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু এপারে বৃষ্টি নেই।

মায়ের শরীরের কিছুই চোখে পড়ল না, কি জানি কি দেখব ভেবে এতক্ষণ চোখ তুলে তাকাইনি। এখন আমরাও প্রদক্ষিণ করে তিনবার আহুতি দিলুম। 

ফিরে...দু-তিন দিন আর উদ্বোধনে যাইনি, মন সরছিল না। ফাঁকা বাড়ি, কী দেখতে যাব? যোগীন-মা ডেকে পাঠালেন। মায়ের ঘর তখনো খালি পড়ে ছিল। সেদিকে আর তাকানো গেল না, কেবলই চোখ ফেটে জল আসছে। যোগীন-মা কাঁদছেন আর বলছেন, "তোরাও যদি না আসবি, আমরা কি করে থাকব? মা চলে গেলেন, সব শূন্য লাগছে।"

[প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণা বিরচিত শ্রীশ্রীমায়ের চরণপ্রান্তে থেকে নিবেদিত]

            (সংগ্রহীত)

          <--আদ্যনাথ-->

==========================


Tuesday, November 9, 2021

29>|| ভূত চতুর্দশী' ও কিছু কথা :-

 29>||-: 'ভূত চতুর্দশী' ও কিছু কথা :- 

কার্ত্তিকমাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথি 'ভূত চতুর্দশী' নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে কালীপুজো ও ভ্রাতৃদ্বিতীয়া এসবের পাশাপাশি ধনতেরস্ (ত্রয়োদশী তিথি), ছট্ পূজা, ভূত চতুর্দশীও পালনীয় দিন হিসেবে গণ্য হয়েছে।

    দীপাবলির যে পাঁচদিন মুখ্যতঃ উৎসব পালিত হয়, তার প্রথম দিনটি ধনতেরস্, দ্বিতীয় দিন ভূত চতুর্দশী এবং এরপরের দিনই দীপাবলির মুখ্য উৎসবটি হয়ে থাকে। কথিত আছে, বিজয়া দশমীর দিন শ্রীরাম লঙ্কাবিজয় করার পর কার্ত্তিকমাসের কৃষ্ণপক্ষের অমাবস্যা তিথিতে অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন। তাই মহানন্দবশতঃ অযোধ্যাবাসী তাদের প্রিয় রাজকুমারের ফিরে আসার আনন্দে এই দিনটিতে সারা অযোধ্যাতে প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোকিত করেছিলেন। সেই থেকেই এই দিনে 'দীপাবলি-উৎসব' শুরু। এই দিন পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র কালীপূজা হয়। কিন্তু, দীপাবলির সাথে কালীপূজার সম্পর্ক নেই। যেহেতু সেইদিনই অমাবস্যা থাকে, তাই অমাবস্যায় কালীপূজা হয়। 

যাই হোক, ফিরে আসা যাক মূল প্রসঙ্গে।

              হিন্দুধর্মের প্রতিটি উৎসবেরই অনেক গূঢ়তর মাহাত্ম্য থাকে, 'ভূত চতুর্দশী'- এই দিনটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এই দিনের মাহাত্ম্যও অনেক বেশি। "মূলতঃ অশুভ শক্তিসমূহের বিরুদ্ধে মনোবলকে দৃঢ় রেখে লড়াইপূর্বক  শুভশক্তির জাগরণ তথা বিজয় ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা"- এটি ভূত চতুর্দশীর মূল গূঢ়-মাহাত্ম্য। 

     'ভূত চতুর্দশী' নামের দ্বারাই বোঝা যায়, ভূত,প্রেত, আত্মা, কালো জাদুবিদ্যা ইত্যাদির সাথে দিনটি ওতঃপ্রোতভাবে জড়িত। ভূত চতুর্দশীর রাতেই প্রত্যেক পরিবারের ১৪ টি মৃত পূর্বপুরুষের আত্মাগণ তাদের  নিজেদের  জীবিত উত্তরপুরুষ-বংশধরদের সাথে দেখা করতে আসেন। এছাড়াও বিভিন্ন আত্মারা তাদের প্রিয় ব্যক্তিদেরও দেখতে আসেন, এটাও মান্যতা।

            আসলে 'ভূত' বলতে 'যা অতীত'-এই অর্থও বোঝানো হয়। তাই আমাদের অতীত পুরুষগণ অর্থাৎ আমাদের গত পূর্বপুরুষকেও সেদিন আমরা স্মরণ করি এবং তাদের উদ্দেশ্যে সারা বাড়িতে ১৪ টি মাটির প্রদীপ   জ্বালিয়ে ঈশ্বর ও আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে থাকি। ভূত চতুর্দশীর রাতটিতে আসুরিক তথা ঋণাত্মক শক্তিসমূহ অধিক শক্তিশালী হয়। তাই আসুরিক শক্তি তথা ঋণাত্মক আত্মাদের দূরে রাখতেও সারা বাড়ি প্রদীপের আলোয় আলোকিত করা হয়। এছাড়া 'চতুর্দশী তিথি'-টি হল কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশতম দিন, তাই এই 'চতুর্দশপ্রদীপ প্রজ্বলন' তার তাৎপর্য্যও বহন করে। তেল বা ঘি দ্বারা মাটির প্রদীপ জ্বালালে তা মানব শরীরের পক্ষে উপকারী এবং তার দ্বারা গৃহে প্রবাহিত বায়ু পরিশোধিত হয়ে জীবানুমুক্ত হয়- এর বৈজ্ঞানিক সত্যতাও রয়েছে।

'রূপচতুর্দশী' নামেও এই দিনটিকে জানা যায়। এই নামটি মৃত্যুর দেবতা যমরাজের সাথে সম্পর্কিত। এই দিন সন্ধ্যায় যমরাজের জন্যও বহু বাড়িতে বাড়ির দক্ষিণদিকে একটি প্রদীপ জ্বালানো হয়ে থাকে। বলা হয়, এই দিন যমরাজের উদ্দেশ্যে প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখলে নরকের ভয় বা অকালমৃত্যুর ভয় কাটে।

পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার পাশাপাশি ভূত চতুর্দশীতে ভেষজগুণযুক্ত ১৪ টি শাকমিশ্রিত ব্যঞ্জন খাওয়া হয়ে থাকে, যা বিশেষ পুষ্টিযুক্ত। আসলে এটি শীতের প্রারম্ভে আমাদের শরীরের জন্য বিশেষ রোগ-প্রতিরোধকের কাজ করে থাকে। অনেকের মতে, ভূত চতুর্দশীর আগের দিন অর্থাৎ 'ধনতেরস্' (ত্রয়োদশী তিথি) হলো 'ধন্বন্তরী' নামক আয়ুর্বেদজ্ঞ-এর জন্মতিথি, যিনি কাশীর রাজা ছিলেন। তাঁর জন্মতিথি ত্রয়োদশী তিথির একেবারে শেষ লগ্নে, চতুর্দশীর শুরুতেই। তাই তাঁকে সন্মান জানিয়েই ও আয়ুর্বেদকে স্মরণ করেই ১৪ টি শাকমিশ্রিত ব্যঞ্জন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য খাওয়া হয়ে থাকে, শীতকালের প্রারম্ভের পরিবর্তিত আবহাওয়া থেকে  সুস্থ থাকবার জন্যই। তাই এই ত্রয়োদশী দিনটিকে তাঁর নামানুসারেই 'ধন্বন্তরী তেরস্' বা 'ধন্তেরস্' বলা হয়। এছাড়াও এই দিনের সাথে ধন ক্রয় বা লাভেরও একটি সম্পর্ক আছে। যদিও অনেকের বিশ্বাস, এই দিনে সোনা-রূপা ইত্যাদি ক্রয় বা লাভ করলে অথবা মহালক্ষ্মী পুজো বা কুবেরের পুজো করলে গৃহস্থের ধন-ঐশ্বর্য্য ও শ্রী বৃদ্ধি হয়। তাই এই ত্রয়োদশী দিনটিকে হিন্দিতে 'ধনতেরস্' নামেও অভিহিত করা হয়। তাই দেশের বিবিধ প্রান্তের (বিশেষতঃ উত্তরভারত ) বহু মানুষ এই দিনে সোনা, রূপা ইত্যাদি ধনসম্পদ ক্রয় করে থাকেন এবং বিবিধ পূজাপাঠও করে থাকেন। 

 পুরাণ মতে, ভূত-চতুর্দশীর দিনই শ্রীকৃষ্ণ নরকাসুরকে বধ করেন। তাই এই দিনটি 'নরক চতুর্দশী' নামেও খ্যাত। নরকাসুর ষোলো হাজার একশোজন কন্যাকে বন্দিনী করে রেখেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ মাকালীর সহায়তায় নরকাসুরকে বধ করে তাদের মুক্ত করেন। এই কন্যাদের পিতা-স্বামীরা তাদের আর নিজের করে মেনে না নিলে, তারা লোকলজ্জায় আত্মহত্যা করতে উদ্যত হয়, তখন শ্রীকৃষ্ণ সকলকে পত্নীরূপে বরণ করে তাদের যোগ্য সন্মান দিয়েছিলেন। 

  আবার, মা চামুণ্ডা এই দিনেই প্রবল হওয়া আসুরিক শক্তি ও ঋণাত্মক প্রেত-আত্মাদের দূরীভূত করে থাকেন মহাকালীরূপে। এছাড়া, বছরের অন্যান্য কৃষ্ণচতুর্দশীর থেকে এই চতুর্দশী বেশি অন্ধকারাচ্ছন্ন থাকে। তাই একে 'কালীচতুর্দশী' -ও বলা হয়। এই নামটি মাকালীর মহত্ব বা কালোতম দিন- এই দুই অর্থেই হয়ে থাকতে পারে বলেই মনে হচ্ছে।

  তাছাড়া, দিবালীর আগের দিনই যেহেতু অনেকে এই দিনেও প্রদীপ জ্বালায়, বাজি পোড়ায়, তাই দেশের কোনো কোনো জায়গায় (মূলতঃ উত্তরভারতে) একে 'ছোটী দিবালী'-ও বলে।

  গ্রামের দিকে এই দিনটিতে খুবই সাবধানে সকলে বাড়ির ভিতরেই বসবাস করেন, মনে একটি মৃদু ভয় রেখে। কারন মান্যতা আছে, এইদিন সমস্ত ঋণাত্মক শক্তি জাগরিত হয়। তান্ত্রিক সিদ্ধিও এই দিনেই অধিক ফলপ্রসূ হয়ে থাকে, এই দিন তাই দেবী কালীর পুজো করে তাতে নরবলির প্রথা এক সময় ছিল, তান্ত্রিক সিদ্ধিকে সফল করবার জন্য। প্রত্যন্ত গ্রামে বহু পূর্বে শিশুদের এই সিদ্ধিলাভের আশায় বলিপ্রদান করা হতো। নরবলির মধ্যে শিশুবলি উৎকৃষ্ট - এই অন্ধবিশ্বাস ছিল। তাই প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে শিশুদের এই দিন বাড়িতেই রাখা হতো, বেরোতে দেওয়া হতো না। যাই হোক, এই ক্রূরতম অন্ধবিশ্বাস আপাতত প্রশাসন বন্ধ করতে সক্ষম হয়েছে, আগামীতেও এটি বন্ধ থাকুক এই বিষয়ে তারা তৎপর। প্রশাসনের চাপে এখন নরবলি বন্ধ হওয়ায় তা ছাগবলির মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। এর দ্বারা মনস্কামনা পূরণ হয় এটি সিদ্ধতান্ত্রিকদের মত। কালোজাদুবিদ্যাও এই দিনেই অধিক প্রয়োগ করা হয়ে থাকে বলেও মত । 

  বহু শ্মশানে ও গৃহস্থে এইদিন কালীপুজোও হয়ে থাকে। মাকালীকে সুগন্ধজাতীয় দ্রব্য (যেমন- চন্দন,পুষ্প ইত্যাদি) দিয়ে পূজা দিলে আশীর্বাদ প্রাপ্ত হওয়া যায়। সকল প্রকার বিঘ্নসমূহকেই বিনাশ বা দূরীভূত করে শুভ শক্তির প্রকাশের আশায় মাতৃশক্তির আরাধনা করা হয়। এই দিন দেবীর পূজার মাধ্যমে মনের আলস্য, ঈর্ষা, দ্বেষ, মোহ ইত্যাদি সকল প্রকার ঋণাত্মক ভাব ত্যাগ করে মনে ভক্তিভাব আনার চেষ্টা করা হয়ে থাকে।


🌺🙏🌺🙏🌺🙏🌺🙏🌺

28>|| কালী বা কালিকা= বর্ননা ||

          28>|| কালী বা কালিকা= বর্ননা||


কালী বা কালিকা তাঁর অন্য নাম শ্যামা বা আদ্যাশক্তি। প্রধানত শাক্ত সম্প্রদায় কালীপূজা করে থাকে। তন্ত্র অনুসারে, কালী দশমহাবিদ্যা নামে পরিচিত।

কালী দুর্গার ললাট থেকে উৎপন্না হয়েছেন—এই বাক্যের তাৎপর্য যে, ললাটের সংকোচনেই ক্রোধভাব প্রকাশিত হয় বলে সদা ক্রোধান্বিতা; রণরঙ্গিনী করাল-বদনা কালীকে ললাট-সম্ভবা বলা হয়েছে। বাস্তবিক কালীও দুর্গার রূপান্তর বিশেষ। ক্রোধাবস্থাপন্না শক্তিকেই কালী বলা হয়েছে।

চণ্ডবধ কালে অসুরগণ সহ যুদ্ধ করতে করতে ক্রোধভরে ভগবতীর মুখ কৃষ্ণবর্ণ হয়ে উঠার পর তাঁহার ললাটদেশ হতে করালবদন অসি-পাশ প্রভৃতি অস্ত্রপাণি কালিকাদেবীর আবির্ভাব হয়েছিল। (মার্কণ্ডেয় পুঃ ৮৭/৫)

কালিকাপুরাণে এর রূপাদি এভাবে বর্ণন আছে –

“নীলোৎপলের ন্যায় শ্যামবর্ণ, চারহাত, দক্ষিণহাত দুইটিতে খট্বাঙ্গ ও চন্দ্রহাস, বামহাত দুইটিতে চৰ্ম্ম ও পাশ, গলায় মুণ্ডমালা, পরনে বাঘের চামড়া, কৃশাঙ্গ, দাঁত দীর্ঘ, অতিভয়ঙ্কর লোলজিহবা, আরক্তচক্ষু, ভীমনাদ, কবন্ধ বাহন, বিস্তৃত মুখ ও কর্ণ স্থুল। এই দেবী তারা ও চামুণ্ডা নামেও অভিহিত হয়ে থাকেন। এর আটজন যোগিনী তাদের নাম-ত্রিপুরা, ভীষণা, চণ্ডী, কত্রী, হন্ত্রী, বিধাতৃকা, করালা ও শূলিনী। এই সকল যোগিনীগণও দেবীর সাথে পূজিত এবং অনুধ্যাত হয়ে থাকেন। দেবীগণের মধ্যে এরই পূজা করলে সৰ্ব্বকামনা সিদ্ধ হয়।” (কালিকা ৬০ অঃ)

তিনি দশ মহাবিদ্যার মধ্যে প্রথম মহাবিদ্যা। যথা তন্ত্রসারে,—

“কালী তারা মহাবিদ্যা ষোড়শী ভুবনেশ্বরী।

ভৈরবী ছিন্নমস্তা চ বিদ্যা ধুমাবতী তথা ॥

বগলা সিদ্ধবিদ্যা চ মাতঙ্গী কমলাত্মিকা।

এতা দশ মহাবিদ্যা সিদ্ধবিদ্যাঃ প্রকীৰ্ত্তিতাঃ ॥


কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধুমাবতী, বগলা, মাতঙ্গী ও কমলা এই দশমূর্ত্তির নাম দশ মহাবিদ্যা; তাঁদের সিদ্ধবিদ্যা ও বলা হয়ে থাকে। সতী দক্ষযজ্ঞে যাবার সময় শিবের নিকট বারবার অনুমতি চাইলেন, কিন্তু মহাদেৰ কোনক্রমেই তাঁকে অনুমতি না দেওয়ায় সতী এই রূপে দশমূর্ত্তি ধারণ করে শিবকে ভীত করেছিলেন এবং তাঁর অনুমতি পেয়েছিলেন।

যত কন সতী শিব না দেন আদেশ।

ক্রোধে সতী হৈলা কালী ভয়ঙ্করবেশ ॥ (অন্নদা মঙ্গল ২৯)

কালীমূর্ত্তির ধ্যান মন্ত্র যথা-----

ওঁ করালবদনাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভুজাম্।

কালিকাং দক্ষিণাং দিব্যাং মুন্ডমালাবিভূষি তাম্ ॥

সদ্যশ্চিন্নশিরঃ খড়গবামাধোর্দ্ধক রাম্বুজাম্।

অভয়ং বরদঞ্চৈব দক্ষিণোদ্ধার্ধপাণিকাম্ ॥

মহামেঘপ্রভাং শ্যামাং তথা চৈব দিগম্বরীম্।

কন্ঠাবসক্তমুন্ডালী-গলদ্রুধিরচর্চিতাম্ ॥

কর্নাবতংসতানীতশ বযুগ্মভয়ানকাম্।

ঘোরদ্রংষ্টাং করালস্যাং পীণোন্নতপয়োধরাং ॥

শবনাং করসংঘাতৈঃ কৃতকাঞ্চীং হসন্মখীম্।

সৃক্কদ্বয়গলদ্রক্ত-ধারাবিস্ফুরিতাননাম্ ॥

ঘোররাবাং মহারৌদ্রীং শ্মশ্মানালয় বাসিনীম্।

বালার্কমণ্ডলাকা রলোচনত্রিয়ান্মি তাম্ ॥

দস্তুরাং দক্ষিণব্যপিমুক্ তালম্বিকচোচ্চয়া ম্।

শবরূপমহাদেবহৃদয় োপরি সংস্থিতাম্ ॥

শিবাভির্ঘোররাবা ভিশ্চতুর্দিক্ষু সমন্বিতাম্।

মহাকালেন চ সমং বিপরীতরতাতুরাম ॥

সুখপ্রসন্নবদনাং স্মেরানন সরোরুহাম্।

এবং সঞ্চিন্তেয়ৎ কালীং সর্বকাম- সমৃদ্ধিদাম্ ॥ (তন্ত্রসার)


দেবী দক্ষিণা কালী করালবদনা ভয়ঙ্করী, মুক্তকেশী ও চতুর্ভুজা, তিনি দিব্য জ্যোতি সম্পূর্ণা, মুন্ডমালা ধারিণী। মায়ের বামদিকের নিচের হাতে সদ্যচ্ছিন্নিত মুণ্ড, উপরের বাম হাতে খড়গ। ডানদিকের উপরের হাত অভয় মুদ্রায় এবং নিচের হাত বরমুদ্রা ধারণ করে  আছেন। মায়ের  গায়ের রং কালো মেঘের প্রভার মত  শ্যামা। তিনি দিগম্বরী অর্থাৎ বস্ত্রহীনা।  উনার গলার মুন্ডমালা গুলো থেকে বের হওয়া রক্ত উনার দেহ কে  রঞ্জিত করছে,  দুটি শবশিশু তার কর্ণভূষণ হওয়াতে দেবীকে ভয়ঙ্করী দেখাচ্ছে। তিনি তাঁর দাঁত দিয়ে নিজের জিহ্বাকে কামড় দিয়ে আছেন, তিনি কোমরে বেঁধে রেখেছেন হাতের মালা। তাঁর মুখে  মৃদুহাসি এবং উনার মুখ থেকে রক্তের ধারা বের হচ্ছে আর উনার মুখে অনন্ত কোটি সূর্যের তেজ বিদ্যমান। তিনি অতিশয় ক্রোদ্ধা, ভয়ংকর নাদকারিণী, উনার তিনটি চোখ আর সেই সকালের সূর্যের মত লালপ্রভাময়। উনার চারদিকে  চিৎকার করছে  শিয়ালের দল। আমি সেই দেবীর ধ্যান করি যিনি শবরুপ মহাদেবের হৃদয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। যার মুখ সুখ-প্রসন্নতায় ভরা। যিনি মোক্ষদায়িনী  এবং সকল ইচ্ছাপূরণকারিণী।

দেবীর অঙ্গের তাৎপর্যঃ


দেবীর মাথায় অর্দ্ধচন্দ্র তাঁহার মোক্ষ-প্রদান শক্তির পরিচায়ক।তাহা হইতে নিঃসৃত অমৃত সাধক কে  অমৃতত্ব বাঁ মোক্ষ প্রদান করিয়া থাকে। দেবী  মুক্তকেশী। তাঁর মুক্তকেশ চির-বৈরাগ্যের প্রতীক। জ্ঞান-অসির আঘাতে তিনি অক্টপাশ ছেদনকারী মা চির বৈরাগ্যময়ী। তাই তাঁর কালো চুল বিস্তৃত।

দেবীর তিন চোখ তিনটি আলোর প্রতীক, চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নি। অন্ধকার বিধ্বংসী তিন শক্তির প্রকাশ। অজ্ঞতা, চন্দ্র, সূর্য ও অগ্নি অজ্ঞানতারূপ অন্ধকার থেকে মুক্ত করে। তিনটি চোখে দেবী অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতকে প্রত্যক্ষ করেন। কারণ,এই শক্তিই হল সৃষ্টি স্থিতি ও প্রলয়ের কর্তা।  দেবীর কানে দুতি বালকের শব যার অর্থ নির্ব্বিকার, নিস্কাম,শিশু্ভাবাপন্ন সাধক মায়ের অতি প্রিয়। দেবী রক্তবর্ণের জিহ্বাকে সাদা দাঁত দিয়ে কামড়ে রেখেছেন। লাল রং  রজোগুণের প্রতীক, সাদা রং সত্ত্বগুণের প্রতীক। সাদা দাঁত দিয়ে লাল জিহবাকে চেপে রাখা। অর্থাৎ সত্ত্বগুণর দ্বারা রজোগুণকে দমন করে রাখা। রজোগুণ ভোগের গুন, ঈশ্বর বিমুখ করে। রজোগুণ দমনের জন্য এই প্রতীক। অনেক সময় আমরা কোন অন্যায় বা মিথ্যাচার করলে জিহ্বার কামড় দেই অর্থাৎ অন্যায় করার স্বীকৃতি।

দেবীর গলায় পঞ্চাশটি মুন্ড দিয়ে মালা পরানো। পঞ্চাশটি মুন্ড পঞ্চাশটি অক্ষরের প্রতীক। ১৪ টি স্বরবর্ণ এবং ৩৬ টি ব্যঞ্জনবর্ণ, অক্ষর ব্রহ্ম, যার ক্ষয় নেই, শব্দ ব্রহ্ম, অক্ষরের দ্বারাই শব্দের উৎপত্তি হয়। এর অবস্থান মস্তকে। আমরা  মন্ত্রোচ্চারণের দ্বারা দেব বা দেবীর বন্দনা করি। এই মন্ত্রের অবস্থান মাথার  তালুতে সহস্রার পদ্মের মধ্যে। তাই অক্ষরের প্রতীক মুন্ড তাঁর গলায় হাত কর্মের প্রতীক। আমাদের সকল কর্মের ফলদাতা  তিনি। সকাম ভক্ত যারা তারা অতৃপ্ত কামনা নিয়ে দেহত্যাগ করে বলে পুনরায় মাতৃ জঠরস্থ হয়, হস্ত মেখলা প্রতীকে সকাম ভক্তের পুণর্জন্ম লাভ করার তত্ত্ব নিহিত।

দেবীর চাইতে বড়তো কিছুই নেই। তাই তিনি কি পরিধান করবেন? বিশ্বব্যাপী শক্তির অবস্থান। শক্তিকে আবরিত করা যায়না। তিনি স্বয়ং প্রকাশ। তাই দেবী উলঙ্গ।দেবী কখন দক্ষিণ পদ কখন বাম্পদ, অগ্রে স্থাপন করেন ইহার অর্থ এক পদে অতীতকে অন্যপদে ভবিষ্যত কে অধিকার করিয়া আছেন।

কালো রং সকল বর্ণের অনুপস্থিত। তাই কালো। কখনো বা তিনি শ্যমা- শ্যামবর্ণা। কালো রং ভয়ের উদ্রেক করলেও শ্যাম রং কোমলতা জাগায়। স্নিগ্ধতা ও কমনীয়তা জাগায়। তাই মাতৃসাধক কালী শ্যামবর্ণা রূপেও দর্শন করেছেন।

মা কালী শবরূপী শিবের বুকে দন্ডায়মানা। শিব স্থির, কালী গতিময়ী। গতি ঠিক রাখতে হলে স্থিরের উপর তার প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। শিব শুভ্রবর্ণ, কালী কালো বর্ণ। সাধক কূটস্থ দর্শন কালে এই শুভ্র রং বেষ্ঠিত কালো রং সাধনায় দেখে থাকেন।

কালীর রূপকল্পনাঃ-

মহাকালী, দক্ষিণাকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী, গুহ্যকালী ও রক্ষাকালী প্রভৃতি নাম অনুসারে কালীমূৰ্ত্তির বিবিধ ভেদ আছে। ইনিই মূল প্রকৃতি; স্বল্পবুদ্ধি ও দুৰ্ব্বল মানুষের উপাসনা কার্য্যে সুবিধা করবার জন্যই তন্ত্রা আদিশাস্ত্রে এই প্রকৃতির কালী, তারা প্রভৃতি নাম ও রূপ কল্পিত হয়েছে। মহানিৰ্ব্বাণতন্ত্রেও এভাবে লেখা আছে-

“উপাসকানাং কার্য্যায় পুরৈব কথিতং প্রিয়ে।

গুণক্রিয়ানুসারেণ রূপং দেব্যাঃ প্রকল্পিতম্ ॥


(মহানিৰ্ব্বাণ ১৩ উল্লাস।)


উপাসকদের কার্য্যের সুবিধার জন্যই গুণক্রিয়া অনুসারে দেবীর রূপ কল্পিত হয়েছে।


আদ্যশক্তির প্রধান মূৰ্ত্তি কালী। শাক্ত উপাসকের মধ্যে প্রায় দশআনা লোক এই মূৰ্ত্তির উপাসক। ভগবতীর যতগুলি মূৰ্ত্তি আছে, তারমধ্যে দুর্গা ও কালীমূৰ্ত্তির বছল প্রচার। এই মূর্ত্তির কল্পনা কতকাল পূর্ব্ব হতে চলে আসছে, তা সহজে নির্ণয় করা দুঃসাধ্য। অনেক পাশ্চাত্য পণ্ডিত ও সেই মতাবলম্বী প্রাচ্য পণ্ডিতরা বলেন, এই মূৰ্ত্তি হিন্দুদের মৌলিক মূৰ্ত্তি নয়, ভারতের আদিম অধিবাসী অনাৰ্য্যদের দেবদেবী হতে সংগৃহীত হয়েছে। এরূপ মীমাংসা বা কল্পনায় কোন ফল আছে কি না তাহা বুঝা যায় না; কারণ, অনেক অনেক প্রাচীন পুরাণে ভগবতীর এই মূৰ্ত্তির কথা পাওয়া যায়। তবে এই পৰ্য্যন্ত স্বীকার করতে হবে যে, তান্ত্রিক যুগেই এই মূৰ্ত্তির উপাসনার নানাবিধ বিধি-নিয়ম সঙ্কলিত ও বহুল প্রচার হয়েছে।


তন্ত্রের কথা ছেড়ে আগে দেখা যাক, পুরাণ আদিতে ভগবতীর কালীমূর্ত্তির উৎপত্তি, পূজা, ধ্যান ইত্যাদি সম্বন্ধে কি কি বিবরণ পাওয়া যায়।


পুরাণের মধ্যে মার্কণ্ডেয় পুরাণখানি অপেক্ষাকৃত প্রাচীন বলে গণ্য। দেবীমাহাত্ম্য চণ্ডী-যা পাঠ বা শ্রবণ করলে ইন্দ্রের ঐশ্বৰ্য্যতুল্য ঐশ্বৰ্য্য ভোগ হয়—সেই চণ্ডীই এই পুরাণের অন্তর্গত। কালিকামূৰ্ত্তির উৎপত্তির কথা চণ্ডীতে দুই স্থানে কথিত হয়েছে। প্রখম,-মহিষাসুর বধের পর যখন দেবতারা শুম্ভ নিশুম্ভের অত্যাচারে উৎপীড়িত হয়ে দেবীর স্তব করেছিলেন, সে সময়ে ভগবতী জাহ্নবীজলে স্নান করতে যাওয়ার ছলে, তাঁদের নিকট গিয়ে জিজ্ঞাস করলেন, তোমরা এখানে কেন ? দেবতারা এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই ভগবতীর শরীর থেকে শিবা অম্বিকা নির্গত হয়ে বললেন,-দৈত্যপত্তি শুম্ভকর্ত্তৃক নিরাকৃত ও তার ভাই নিশুম্ভ কর্তৃক পরাজিত এই দেবতারা একত্র হয়ে আমার স্তব করছে। অম্বিকা ভগবিতীর শরীর-কোষ হতে উৎপন্ন হয়েছেন বলে তিনি কৌষিকী নামে বিখ্যাত হলেন ও হিমাচল আশ্রয় করে রয়েছেন। কৌষিকীর উৎপত্তির পর ভগবতীও নিজ গৌরবর্ণ ত্যাগ করে কৃষ্ণবর্ণ হয়েছিলেন বলে তিনি ‘কালিকা’ নামে বিখ্যাত হলেন এবং তিনিও হিমাচল আশ্রয় করে অবস্থান করতে লাগলেন; এই কালিকার রূপ কি, তা এস্থানে চণ্ডীতে উল্লেখ নেই। তারপরে চণ্ডীতে দ্বিতীয়স্থানে যে কালীমূর্ত্তির কথা আছে, তা এই;- কৌষিকীর হুঙ্কারে শুম্ভের সেনাপতি ধূম্রলোচন ভস্মীভূত হলে, শুম্ভ চগুমুগু নামক দুই প্রচণ্ড সেনাপতিকে বহুসৈন্য সহ কৌষিকীকে আনবার জন্য আদেশ দিলেন। চণ্ডমুণ্ড সৈন্যবল-পরিবৃত হয়ে মহাদৰ্পে দেবীর নিকট হিমাচলে উপস্থিত হলেন। দেবী তাদের দর্প দেখে সামন্য হাসলেন মাত্র। চণ্ডমুণ্ড এসে দেবীকে ধরতে অগ্রসর হল। দৈত্যদ্বয় নিকটে আসামাত্র দেবী মহাক্রোধে তাদের প্রতি তাকালেন। ক্রোধে তাহার মুখমণ্ডল কৃষ্ণবর্ণ হয়ে উঠল এবং তাঁহার ভ্রুকুটি-কুটিল ললাট হতে অতি শীঘ্ৰ এক দেবী নির্গত হয়ে, অসুরদেরকে প্রহার করতে লাগলেন। এই দেবীই কালী। এর রূপ এভাবে চণ্ডীতে উল্লেখ আছে-


“কালী করাল-বদনা বিনিষ্ক্রান্তাসিপাশিনী।

বিচিত্রখট্বাঙ্গধরা নরমালাবিভূষণা ॥

দ্বীপিচর্মপরীধানা শুষ্কমাংসাতিভৈরবা।

অতিবিস্তারবদনা জিহ্বাললনভীষণা।

নিমগ্নারক্তনয়না নাদাপূরিতদিঙ্মুখা ॥

কালী, করালবদনা (লম্বিত-মুণ্ড-হস্তা), অসিপাশধারিণী, বিচিত্র থট্বাঙ্গধরা, নরমুণ্ডমালা শোভিতা, ব্যাঘ্ৰ চৰ্ম্ম পরিধানা, শুষ্কমাংসা, অতি ভয়ানক মূৰ্ত্তি, অতি বিস্তৃতমুখমণ্ডল, লোলরসনা, ভীষণা, গাঢ়-রক্তনয়না, হুঙ্কার শব্দে দিগ্মণ্ডল পরিপূর্ণকারিণী। এই কালী যুদ্ধে চণ্ডমুণ্ডকে বিনাশ করে, কৌষিকীর নিকট তাঁদের মুণ্ড দুইটি উপহার দিয়ে বললেন,- আমি চণ্ডমুণ্ড নামক মহাপশু দুটিকে হনন করে এনেছি, এখন যুদ্ধযজ্ঞে শুম্ভ নিশুম্ভকে তুমি নিজে সংহার কর। কৌষিকী হেসে কালীকে বললেন,-চণ্ডমুণ্ডকে বধ করেছ, তারজন্য তোমার নাম চামুণ্ডা বলে বিখ্যাত হবে।

সচরাচর যে কালী বা শ্যামা-মূৰ্ত্তি দেখা যায় তার সাথে এই মূৰ্ত্তির সম্পূর্ণ ঐক্য নেই, কিছুটা সাদৃশ্য আছে।

রক্তবীজবধের সময়ে এই কালী জিহ্বা বিস্তার করে রক্তবীজের শরীর থেকে নির্গত সমস্ত রক্ত ধারণ করে পান করেছিলেন। কৌষিকীর অস্ত্রপ্রহারে রক্তবীজ বিনষ্ট হয়।

চণ্ডীতেও কালীপূজার কোন বিধান নেই। শুম্ভ নিশুম্ভবধের পর দেবী দেবতাদের কে যে পূজাপদ্ধতি বলেছেন; তা শারদীয় মহাপূজার কথা।

দেবীভাগবতের ৫ম স্বন্ধে ২৩শ অধ্যায়ে কৌষিকী উৎপত্তির পর পাৰ্ব্বতীর শরীর কৃষ্ণবর্ণ হয়ে কালিকা নামে প্রসিদ্ধ হওয়ার কথা আছে; কিন্তু এই কালিকার নাম কালরাত্রি বলেই কথিত হয়। চণ্ডীতে বলা এই কালিকার কোন কার্য্য পাওয়া যায় না, কিন্তু দেবীভাগবতে এর সাথে ধূম্রলোচনের ঘোর সংগ্রাম ঘটেছিল এমন বর্ণন হইয়াছে ও যুদ্ধের পরে এরই হুঙ্কারে ধূম্রলোচন বিনষ্ট হয়। ইনি বরাবর কৌষিকীর পাশে উপস্থিত ছিলেন। দেবীভাগবতেও চণ্ডমুণ্ড বধের সময় কৌষিকীর কপাল হতে ব্যাঘ্ৰচৰ্ম্মাম্বরা, ক্ররা, গজচৰ্ম্মোত্তরীয়া, মুণ্ডমালাধরা, ঘোরা, শুস্কবাপীসমোদরা, খড়গপাশধরা, অতি ভীষণা, খট্ট্বাঙ্গধারিণী, বিস্তীর্ণ-বদন, লোলজিহ্বা কালীর উৎপত্তি কথা আছে। এই কালী চামুণ্ডা নামে বিখ্যাত হন। ইনিই রক্তবীজের রুধিরপায়িনী। এছাড়া অন্যান্য পুরাণেও কালী, ভদ্রকালী, মহাকালী ইত্যাদি নাম পাওয়া যায়, কিন্তু উৎপত্তি সম্বন্ধে বিশেষ কোন বিবরণ পাওয়া যায় না।

কালীমূর্ত্তীর রূপক ভেদ করলে বুঝা যায়, ইহা সৰ্ব্ববিধ্বংসী মহাকালের প্রণয়িনী-অনন্তকালরূপী শিব পদতলে দলিত হয়েছেন, সৰ্ব্বধ্বংসকারিণী শক্তিজ্ঞাপক অসি হন্তে; ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালবাচক ত্রিনয়ন ইত্যাদি।

এস্থানে যতগুলি কালীমূৰ্ত্তির কথা দেওয়া হল, তার কোনটাই শিবারূঢ়া নহে, শবাসনার কথা ‘শ্যামা’ শব্দে দ্রষ্টব্য।


শক্তি পূজায় যে পঞ্চমকার যথা- মদ্য-মাংস-মৎস্য-মুদ্রা-মৈথুন এর কথা পাই তার অর্থ লোকনাথ বসু তাঁর হিন্দুধর্ম মর্ম গ্রন্থে লিখেছেন, পঞ্চ ম কারের প্রথমটি অর্থাৎ মদ কেবল এক পানীয় নয়। তা আসলে ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে ক্ষরিত অমৃতধারা বা সাক্ষাৎ আনন্দ। তন্ত্রসাধনার মাধ্যমে কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রত হলে খুলে যায় মস্তিষ্কের উপরিতল বা ব্রহ্মরন্ধ্র। তখন যে আনন্দধারা প্রবহমান হয়, তাই আসলে মদ্য বা কারণ! আবার সাধকজীবন ও দশমহাবিদ্যা গ্রন্থে তারাপ্রণব ব্রহ্মচারীর মত, ‘মা মা’ বলতে বলতে যখন ভক্তি নেশার মতো থিতু হবে অন্তরে, তখন সেই মাদকতাকেই বলতে হবে মদ্য!


কালিকা উপনিষদও মদ্য বা কারণবারির এই অন্তর্নিহিত অর্থের দিকেই জোর দিয়েছে। তার নবম শ্লোকে বলা হয়েছে, পঞ্চমকারের বেদসম্মত আধ্যাত্মিক অর্থ বুঝে যিনি দেবীরর পূজা করবেন, তিনিই সতত ভজনশীল, তিনিই ভক্ত। তাঁর প্রচ্ছন্নতা দূর হয়ে মহত্ব প্রকাশিত হয়। তিনি নিরবিচ্ছিন্ন সুখ শান্তি লাভ করে সংসারপাশ থেকে চিরমুক্ত হন। সিদ্ধমন্ত্রজপকারী সাধকের অনিমাদি অষ্টসিদ্ধি লাভ হয়। তিনি জীবন্মুক্ত, সর্বশাস্ত্রবিদ হন। তাঁর হিংসাবৃত্তি বিনষ্ট হওয়ায় তিনি সকল জীবের বিশ্বাসভাজন হন।


কিন্তু, সাধারণ মানুষ মদ্যের এই গূঢ় অর্থ ভুলেছে। বঙ্গে তন্ত্রমতে কালী উপাসনা জনপ্রিয় হওয়ায় একসময় পঞ্চ ম কার-কে কেবল বহিরঙ্গেই ব্যবহার করতে থাকে সুবিধাবাদী শাসকশ্রেণি। সে চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের সময়ের কথা। তখন মদ মানে উল্লাস, মাংসে-মৎস্যে ভোজন, মুদ্রা মানে যৌনসুখের আসন এবং মৈথুন বলপূর্বক শরীরসম্ভোগ! শান্ত বাঙালি চৈতন্যদেবের প্রভাবে এবং ইংরেজ শাসনের নৈতিকতার জেরে যৌনাচারের দিকটি পরে এড়িয়ে গেল ঠিকই, কিন্তু জিভে লেগে রইল মাংস আর মৎস্যের স্বাদ। আর, মাথায় রইল মদের আচ্ছন্নতা। প্রতি বছর কালীপুজোর রাতে যা তুঙ্গে ওঠে। ঠিক বাল্মীকি প্রতিভার ডাকাতরা যা বলেছে- “আজ রাতে ধুম হবে ভারি, নিয়ে আয় কারণ বারি, জ্বেলে দে মশালগুলো, মনের মতন পুজো দেব- নেচে নেচে ঘুরে ঘুরে!”


কিন্তু, মা কি ভক্তের এই বিস্মৃতিতে আদৌ প্রসন্ন হন?


তথ্যসূত্র- বিশ্বকোষ চতুর্থ খন্ড, দেবদেবীতত্ত্ব সহ পুরাণ ও উপনিষদ।