61>সন্ন্যাসীরা কেবল গেরুয়া কাপড় পরে কেন???? ইতিহাস::----
শ্মশানে মৃতদেহ নামিয়ে রাখার পর পুরোনো কাপড় ফেলে দিয়ে দেহটি গঙ্গায় স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে শুরু করা হয় মৃতের অন্তিম যাত্রা। ওই ফেলে দেওয়া কাপড় সংগ্রহ করে আনতেন বৌদ্ধ শ্রমণেরা। লাল মাটির উপর অনেক দিন ফেলে রাখলে সেই কাপড়ে মাটির রঙ ধরত। তখন মাটি থেকে কাপড় তুলে নিয়ে সামান্য ধুয়ে তাঁরা গায়ে পরতেন। এইভাবে তৈরি হত সন্ন্যাসীর পরিধেয় আড়াই হাজার বছর আগে।
বৈদিক যুগের সন্ন্যাসী প্রায়শই নগ্ন, লজ্জা তাঁকে ছেড়ে গেছে। তবু দিন পাল্টায়। অরণ্য কেটে যতই বসতি স্থাপন করা হল, ততই সন্ন্যাসীরও প্রয়োজন হল বসনের। সামাজিকতার কারণে তো বটেই, শীত এবং রৌদ্রের তাপ হতে বাঁচার তাগিদেও।
কাপড়ে মাটির রঙ ধরানো হত একথা মনে রাখার জন্যেই যে, এ দেহ একদিন মাটি হয়ে যাবে। তাই, জড়িয়ে পোড়ো না এ দেহের মায়ায়। মাটির রঙে রাঙানো কাপড় সদাই সেকথা মনে করাতো।
কাপড় রাঙানোর এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ বলে মনে হল একদিন। কনখলে আর রাজমহেন্দ্রীর মত জায়গায় এমন সব পাহাড় পাওয়া গেল যাদের রঙ লালচে গেরুয়া। তখন সেই পাথর নিয়ে আসা হল। দুই খণ্ড বাদামী পাথর দুহাতে ধরে জলের মধ্যে ডুবিয়ে ক্রমাগত ঘষে ঘষে আমিও রঙ তৈরি করেছি। জলের সঙ্গে গুলে সেই আশ্চর্য রঙ তৈরি হলে কাপড় বারবার ডুবিয়ে ডুবিয়ে নিংড়ে নিংড়ে থুপে থুপে রঙ করেছি। হাত ব্যথা, কোমর ব্যথা, শিরদাঁড়া ব্যথা হয়ে গেলেও গৈরিক কাপড় শুকিয়ে গেলে গায়ে পরবার সময় সে কী অনির্বচনীয় শান্তি, স্থির ধ্রুব আনন্দ!
আপনি বলবেন, হয়ত বলবেন, কেন বাজার থেকে গেরুয়া থান কাপড় কিনে আনলেই তো হয়। তার থেকে জামা, কাপড় বানিয়ে নিলেই হল। এত কাণ্ডের দরকার কী? কিন্তু অমন রেডিমেড কাপড়ে এত বছরের ইতিহাস মাখা থাকত কি? মাটির সুঘ্রাণ, মাটি হয়ে যাবে সব একদিন, মনে পড়ত কি? দশনামী সাধুদের কাপড় অন্তত মাটিতে ছুপিয়েই পরার রীতি।
কালক্রমে কনখল কিংবা রাজমহেন্দ্রীর সেই আরক্তসুন্দর গিরিশ্রেণী ধ্বংস হয়ে গেল। মাটির নীচে পাওয়া গেল কপারের মাইন। লাল পাথর চলে গেল, এল এক কেমিকাল। খুব সহজে জলে গুলে যায়। রঙ উজ্জ্বল, পাক্কা। এখন এই কেমিকালেই সাধুরা কাপড় রাঙান। একটা ইতিহাস হারিয়ে গেল।
আমি তবু রেখে দিয়েছি মাটিতে রাঙানো সেসব কিছু কাপড়। পরি মাঝে মাঝে। সেই কাপড়ের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে মনে পড়ে হাজার হাজার বছরের ইতিকথা। ভালবাসি মৃত্যুকে, সে আসবে, সে আসছে, আসার আগে আমার অঙ্গে সে তার অভিজ্ঞান জড়িয়ে দিয়েছে।
অসাধারণ একটি তথ্য জানতে ও জানাতে পেরে ভীষণ ভালো লাগলো এবং সমভাবে সমৃদ্ধ হলাম
🙏🙏🙏🙏🙏🙏🙏
সন্মাত্রানন্দ
সংগৃহীত