Friday, July 14, 2023

42>হিন্দি ভজন (4খন্ড)ok हिन्दी

 


 42>হিন্দি ভজন (4খন্ড)ok हिन्दी


●1>ऐसी लागी लगन

 ●2>खण्डन भव

 ●3>प्रेम मुदित मन से कहो

====================

●1>ऐसी लागी लगन

है आँख वो जो श्याम का दर्शन किया करे,

है शीश जो प्रभु चरण में वंदन किया करे ।

बेकार वो मुख है जो व्यर्थ बातों में,

मुख है वो जो हरी नाम का सुमिरन किया करे ॥

हीरे मोती से नहीं शोभा है हाथ की,

है हाथ जो भगवान् का पूजन किया करे ।

मर के भी अमर नाम है उस जीव का जग में,

प्रभु प्रेम में बलिदान जो जीवन किया करे ॥


ऐसी लागी लगन, मीरा हो गयी मगन ।

वो तो गली गली हरी गुण गाने लगी ॥


महलों में पली, बन के जोगन चली ।

मीरा रानी दीवानी कहाने लगी ॥


कोई रोके नहीं, कोई टोके नहीं,

मीरा गोविन्द गोपाल गाने लगी ।

बैठी संतो के संग, रंगी मोहन के रंग,

मीरा प्रेमी प्रीतम को मनाने लगी ।

वो तो गली गली हरी गुण गाने लगी ॥


राणा ने विष दिया, मानो अमृत पिया,

मीरा सागर में सरिता समाने लगी ।

दुःख लाखों सहे, मुख से गोविन्द कहे,

मीरा गोविन्द गोपाल गाने लगी ।

वो तो गली गली हरी गुण गाने लगी ॥

===================


 ●2>खण्डन भव

 

खण्डन भव बन्धन जग वन्दन वन्दि तोमाय।

निरञ्जन नररूपधर निर्गुण गुणमय ॥

मोचन अघदूषण जगभूषण चिद्घनकाय।

ज्ञानाञ्जन विमल नयन वीक्षणे मोह याय ॥

भास्वर भाव सागर चिर उन्मद प्रेम पाथार ।

भक्तार्जन युगलचरण तारण भव पार ॥

 

जृंभित युग ईश्वर जगदीश्वर योगसहाय ।

निरोधन समाहित मन निरखि तव कृपाय ॥

भञ्जन_दुःखगञ्जन करुणाघन कर्मकठोर ।

प्राणार्पण जगत_तारण कृन्तन कलिडोर ॥

वञ्चन कामकाञ्चन अतिनिन्दित इन्द्रिय राग ।

त्यागीश्वर हे नरवर देह पदे अनुराग ॥

निर्भय गतसंशय दृढनिश्चयमानसवान ।

निष्कारण भकत_शरण त्यजि जातिकुलमान ॥

सम्पद तव श्रीपद भव गोष्पद वारि यथाय ।

प्रेमार्पण समदरशन जगजन दुःख याय ॥

नमो नमो प्रभु वाक्यमनातीत

मनोवचनैकाधार

ज्योतिर ज्योति उजल हृदिकन्दर

तुमि तमोभञ्जनहार ॥

धे धे धे लंग रंग भंग बाजे अंग संग मृदंग

गाइछे छन्द भकतवृन्द आरति तोमार ॥

जय जय आरति तोमार

हर हर आरति तोमार

शिव शिव आरति तोमार ॥

 =====================


●3>प्रेम मुदित मन से कहो

प्रेम मुदित मन से कहो राम राम राम,

राम राम राम, श्री राम राम राम |

पाप कटें दुःख मिटें लेत राम नाम |

भव समुद्र सुखद नाव एक राम नाम ||

परम शांति सुख निधान नित्य राम नाम |

निराधार को आधार एक राम नाम ||

संत हृदय सदा बसत एक राम नाम |

परम गोप्य परम इष्ट मंत्र राम नाम ||

महादेव सतत जपत दिव्य राम नाम |

राम राम राम श्री राम राम राम ||

मात पिता बंधु सखा सब ही राम नाम |

भक्त जनन जीवन धन एक राम नाम ||

=====================


Monday, June 26, 2023

41>|| দুর্বা ঘাস::--||

   41>|| দুর্বা ঘাস::--||

দুর্বা ঘাস অতি পবিত্র কেন এবং সকল দেবতার পূজায় লাগে কেন ?

পথে, ঘাটে, মাঠে সকলের পায়ের নিচে থাকে, সকলেই পাড়িয়ে চলে,তথাপি দূর্বা ঘাস অতি পবিত্র। সকল পূজায় লাগে। 

সকল দেবতাই দূর্বা ঘাসে তুষ্ট।

কারন খুঁজতে গিয়ে পেলাম 

সাধারণ এক ঘাস, অথচ তাকে ছাড়া যে কোনও পুজোই অসম্ভব বলা চলে। সঙ্কল্প করা থেকে আরম্ভ করে যজ্ঞাহুতি, সব কাজেই প্রয়োজন হয় দূর্বার। আবার পার্বতীপুত্র গণেশের ভীষণ প্রিয় এই ঘাস।

আসলে কিন্তু এই দূর্বা ঘাস এক অসুর।

দূর্বা এক অসুরের নাম অথচ অসুর হয়েও দেবপুজোয় অতি আবশ্যক হয়ে ওঠার কাহিনী, অতি সুন্দর সেই কাহিনী, 

আমাদের সকল শুভ কর্ম, যে কোনও পবিত্র অনুষ্ঠানে ও পূজা পার্বনে অতি প্রয়োজনীয় সরু ও তীক্ষ্ণ ডগা বিশিষ্ট এই বিশেষ ঘাস।

 কাউকে আশীর্বাদ করার জন্যও ব্যবহৃত হয় ধান ও দূর্বা। কিন্তু হিন্দুদের পুজোয় এই ঘাসের এত প্রয়োজন কেন, তা নিয়ে প্রচলিত রয়েছে বেশ কিছু কাহিনি।

যার মধ্যে প্রথমেই বলতে হয় দূর্বা নামক অসুরের কাহিনি। হ্যাঁ, এই নামেই এক অসুরের উল্লেখ মেলে পুরাণে। তবে অসুর বলতে আমরা যেমনটা বুঝি, দূর্বা মোটেও তেমন ছিল না। অন্যান্য অসুরদের মতো কুকর্ম না করে ঈশ্বর সাধনা করেই দিন কাটত তার। 

তার পরম আরাধ্য ছিলেন বিষ্ণু। কিন্তু দূর্বার এই আচরণ মোটেই পছন্দ হত না তার মায়ের। 

একবার তিনি ছেলেকে আদেশ দিলেন ব্রহ্মার তপস্যা করে অমরত্বের বর প্রার্থনার জন্য। দূর্বা ভালোমতোই জানত এমন বর পেলেই তাকে ত্রিলোক জয় করতে বলবেন তার মা। কিন্তু মাতৃআজ্ঞা তো পালন করতেই হবে। তাই সে তপস্যা শুরু করে। বেশ কয়েক বছর তপস্যার পর দূর্বার সামনে ব্রহ্মা প্রকট হন। ব্রহ্মাকে দেখামাত্রই সে করজোড়ে প্রণাম করে। তারপর সবিস্তারে জানায় কেন সে তপস্যায় বসেছে। সবটা শোনার পর ব্রহ্মা তাকে সত্যি সত্যি অমরত্বের বর দেন। কিন্তু একটু অন্যরকম ভাবে। চতুরাননের আশীর্বাদে দূর্বাসুর পরিণত হয় এক বিশেষ ঘাসে। এবং স্বয়ং ব্রহ্মা বলেন, এই ঘাস যে কোনও পুজোয় আবশ্যিক উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। সেই থেকেই দূর্বা ঘাসের প্রচলন শুরু।

এ তো গেল দূর্বাসুরের গল্প। এছাড়াও অনেকে বলেন দূর্বা আসলে ত্রিদেবের কোনও এক দেবতার চুলের অংশ। অন্যদিকে এমনটাও শোনা যায়, এই ঘাস আসলে মা সীতা নিজের রক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। 

আবার অমৃত উত্থানের প্রসঙ্গেও উল্লেখ মেলে এই বিশেষ ঘাসটির। তবে আরও একটি কাহিনি দূর্বার জনপ্রিয়তার সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত যে কাহিনি থেকেই গণেশের দূর্বা প্রীতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 

শোনা যায়, কোনও এক ভয়ংকর অসুরের সঙ্গে যুদ্ধের পর গণেশের শরীর ভয়ানক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। সেই সময় ২১টি দূর্বাঘাস তাঁর মাথার উপর রাখায় তিনি শান্ত হয়েছিলেন। 

সেই থেকেই গণেশ পুজোয় অন্তত ২১টি দূর্বা দিতেই হয়। তবে শুধুমাত্র পৌরাণিক কাহিনি নয়, দূর্বার আবশ্যিকতার নেপথ্যে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যাও রয়েছে। 

আসলে এই ঘাস শরীর ঠান্ডা রাখতে বিশেষভাবে কাজে লাগে। তাই মাথায় দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করার কিংবা পুজোর সময় দূর্বার আংটি পরার রেওয়াজ রয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, হিন্দু দেবদেবীর পুজোয় ব্যবহৃত অন্যান্য অনেক উপকরণের মতোই দূর্বা মানুষের শরীর সুস্থ রাখতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

          "সংগৃহীত"

==========================

সমস্ত পূজাতে দুর্বা ঘাসের প্রয়োজন হয়। কেন? পুরানে কথিত দুর্বাসুর নামে এক কৃষ্ণ ভক্ত অসুর ছিলেন। দুর্বাসুরের মা কৃষ্ণ বিদ্বেষী ছিলেন। দুর্বাসুরের বাবা, ভাই দেবতার হাতে মারা যান। তাই মা দেবতার স্বর্গ রাজ‍্য ধ্বংস ও দেবতার মৃত্যু চাইতেন। মা দুর্বাসুরকে ত্রিদেবের তপস‍্যা করে (ব্রক্ষ্মা বিষ্ণু শিব) অমর হয়ে ত্রিলোক জয় করতে আদেশ দিলেন। মা ত্রিলোকের রাজমাতা হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করল। মায়ের কথায় দুর্বাসুর নির্জনে কঠোর তপস‍্যা শুরু করে। হাজার বছর তপস‍্যার ফলে তার শরীরের মাংস পচে খসে পড়ে। উঁইপোকা ও পোকামাকড়ে খেয়ে হাড়ও খসে মাটিতে মিশে গেছে। তখনও ত্রিদেবের নামে ধ্যান হচ্ছে। দেবতারা ভয় পেয়ে দুর্বাসুরের তপস‍্যা ভঙ্গে ব‍্যর্থ হয়। অবশেষে ত্রিদেব দুর্বাসুরের কাছে এসে ব্রক্ষ্মা কমন্ডুলের জল ছিটিয়ে পুর্ব রুপ দিয়ে বর প্রার্থনা করতে বললেন।

দুর্বাসুর বললেন প্রভু আমি মাতৃ আজ্ঞাতে তপস‍্যা করেছি। মা অমরত্ব বর নিতে বলেছেন। হে গোবিন্দ আমাকে অমরত্ব বর দিলে মা আবারো খারাপ কাজ করাবে। তাই এমন বর দিন যাতে আমি অমরও হতে পারি আবার আপনার সেবায়ও লাগতে পারি। আর আমার দ্বারা জগতের কারও অনিষ্ট না হয়। ত্রিদেবরা সন্তুষ্ট হয়ে বললেন শুধু ত্রিদেব নয় জগতের সব দেবতার সেবায় লাগবে তুমি। দুর্বাসুর তুমি দুর্বা ঘাসে পরিনত হয়ে সব দেবতার পূজায় লাগবে। অক্ষয় তৃতীয়ায় অক্ষয় বরে জগতে সবাই মারা গেলেও দুর্বা ঘাস কখনো মরবে না। অমর থাকবে পৃথিবীতে। পূজাতে দুর্বা পাতা লাগে তিনটি। তিনটি পাতায় ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু, শিব অবস্থান করেন। জগতে কোন শুভ কাজ ত্রিদেবকে ছাড়া সম্ভব নয়। তাই শুভ কাজে দুর্বা ছাড়া আশীর্বাদ হবে না। সেই থেকেই দেবদেবীর পূজায় দুর্বার প্রয়োজন হয়।

সংগৃহীত

======================

   >||  দূর্বা ঘাস ||

প্রশ্ন ছিল কি এমন জিনিষ যাকে পায়ের নিচে পাড়িয়ে চলি, তাকেই আবার সকল দেবতার পুজোয় লাগাই।ওটি ছড়া কোন পুজাই হবেনা।

বস্তুটি সামান্য হয়েও অসামান্য।

পুজোকরার সময় ছাড়া তাকে অবহেলায় আবর্জনা রূপে গণ্য করি।

"কোন দেশেতে তরুলতা

সকল দেশের চাইতে শ্যামল?

কোন দেশেতে চলতে গেলেই

দলতে হয় রে দূর্বা কোমল?"

   কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা কবিতার অংশ।


হ্যাঁ চলতে গেলেই পায়ের নিচে দলতে হয় দুর্বাঘাস।

সেই সামান্য বস্তুটি হল দুর্বা ঘাস,

দুর্বা ঘাস সব দেবতার পূজায় লাগে,

অথচ অবহেলায় দূরেই থাকে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এমন কেন?

 কি আছে বা কে এই দূর্বা ঘাস?

কেন অবহেলিত হয়েও সকল দেবতার পুজোয় লাগে?


এবার দিচ্ছি সকল প্রশ্নের উত্তর::---


পুরানে কথিত দুর্বাসুর নামে এক কৃষ্ণভক্ত অসুর ছিলেন। দুর্বাসুরের মা কৃষ্ণ বিদ্বেষী ছিলেন। দুর্বাসুরের বাবা, ভাই দেবতার হাতে মারা যান। তাই মা দেবতার স্বর্গ রাজ‍্য ধ্বংস ও দেবতার মৃত্যু চাইতেন। 

দুর্বাসুরের মা মনে মনে ত্রিলোকের রাজমাতা হওয়ার ইচ্ছার কারনে তার ছেলে দুর্বাসুরকে ত্রিদেবের তপস‍্যা করে (ত্রি দেব হলেন ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু, ও  শিব) অমর হয়ে ত্রিলোক জয় করতে আদেশ দিলেন।

মায়ের আদেশে দুর্বাসুর নির্জনে কঠোর তপস‍্যা শুরু করে। হাজার বছর তপস‍্যার ফলে তার শরীরের মাংস পচে খসে পড়ে। উঁইপোকা ও পোকামাকড়ে খেয়ে হাড়ও খসে মাটিতে মিশে গেছে। তখনও ত্রিদেবের নামে ধ্যান হচ্ছে। দেবতারা ভয় পেয়ে দুর্বাসুরের তপস‍্যা ভঙ্গে বহু চেষ্টা করেও ব‍্যর্থ হন। অবশেষে ত্রিদেব দুর্বাসুরের কাছে এসে ব্রক্ষ্মা কমন্ডুলের জল ছিটিয়ে দূর্বাসুরের পুর্ব রুপ ফিরিয়ে দিয়ে দূর্বাসুরকে  বর প্রার্থনা করতে বললেন।

দুর্বাসুর বললেন প্রভু আমি মাতৃ আজ্ঞাতে তপস‍্যা করেছি। মা অমরত্ব বর নিতে বলেছেন। হে গোবিন্দ আমাকে অমরত্ব বর দিলে মা আবারো খারাপ কাজ করাবে। তাই এমন বর দিন যাতে আমি অমরও হতে পারি আবার আপনার সেবাতেও লাগতে পারি। আর আমার দ্বারা জগতের কারও কোন প্রকার অনিষ্ট না হয়। ত্রিদেবগণ দুর্বাসুরের একম প্রার্থনায় সন্তুষ্ট হয়ে বললেন শুধু ত্রিদেব নয় জগতের সব দেবতার সেবায় লাগবে তুমি। দুর্বাসুর তুমি দুর্বা ঘাসে পরিনত হয়ে সব দেবতার পূজায় লাগবে। অক্ষয় তৃতীয়ায় অক্ষয় বরে জগতে সবাই মারা গেলেও দুর্বা ঘাস কখনো মরবে না। অমর থাকবে পৃথিবীতে। পূজাতে দুর্বা পাতা লাগে তিনটি। তিনটি পাতায় ব্রক্ষ্মা, বিষ্ণু, শিব অবস্থান করেন। জগতে কোন শুভ কাজ ত্রিদেবকে ছাড়া সম্ভব নয়। তাই শুভ কাজে দুর্বা ছাড়া আশীর্বাদ হবে না। সেই থেকেই দেবদেবীর পূজায় দুর্বার প্রয়োজন হয়।

           ( সংকলিত )

   <----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->

==========================

 

Sunday, June 25, 2023

40>|| বাবা মহারাজ/শঙ্কর ক্ষেপা=তারাপীঠ

 


40>||বাবা মহারাজ/শঙ্কর ক্ষেপা=তারাপীঠ

তারাপীঠের  সিদ্ধপুরুষ শঙ্করক্ষেপা,/

বাবা মহারাজ।

বাবা মহারাজ সম্পর্কে কিছু কথা।

তারাপীঠ মহাশ্মশানের পশ্চিম দিকে দ্বারকার নদীর অপর পারে কবিচন্দ্রপুর

 নামক  গ্রাম । এই গ্রামেই ১৯২৬ সালে সাধক শংকর ক্ষ্যাপা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর পিতার নাম ছিল যোগীন দাস। যোগীন দাসের দুটি ছেলে নারায়ন আর শংকর এবং একটি মেয়ে ছিল। যোগেন পেশায় ছিলেন তন্তুবায়। বিষয় সম্পত্তি বলতে বিশেষ কিছু তাঁর ছিল না। অভাব-অনটনের সংসার। 

ছোটবেলা থেকেই শংকর অন্যান্য ছেলেদের হতে ভিন্ন প্রকৃতির ছিল। তার সমবয়সী ছেলেরা যখন ছুটোছুটি করে খেলায় মত্ত থাকে শংকর তখন গ্রামের নির্জন জঙ্গলে একা একাই ঘুরে বেড়ায়, মাঝে মাঝে জঙ্গলের মধ্যে বসে গভীর চিন্তায় ডুবে যায়! 

আত্মভোলা শংকরের পার্থিব কোন কিছুর উপরে যেন কোনো আকর্ষণ তার ছিল না ! কেউ ভাবতে পারতো না শংকর ভগবানের সাধনা করতে নির্জন জঙ্গলে যায়! এইটুকু ছেলে সাধনার বোঝেই বা কি ! তাই গ্রামের সকলে তাকে “শংকর ক্ষ্যাপা” বলেই ডাকতে লাগল।

যতদূর শোনা যায় যে বামাক্ষ্যাপার সিদ্ধি লাভের পর তারাপীঠ মহাশ্মশানে অনেকদিন কোন সিদ্ধ-সাধকরা তারা সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন কিনা তা জানা যায় না। 

তবে সাধক বামাক্ষ্যাপার পর এমন আত্মভোলা, নির্লোভ সাধক আর তারাপীঠে দেখা যায়নি। এই সহজ-সরল আত্মভোলা সাধক‌ই হোলেন শংকর খ্যাপা বা শংকর বাবা।

বালক শঙ্করের নানান বিষয়ে সাহস দেখে গ্রামের সকলে অবাক হয়ে যেতো!

মাঝে মাঝে শংকর তার দাদার সাথে গরুর ঘাস কাটতে মাঠে যেতো এবং গরু চরাতেও যেতো। তবে, সংসারের কাজে মন বসতো না শঙ্করের। তাই সে সময় পেলেই চলে যেত মাঠের ধারে জঙ্গলের মধ্যে “জটাধারীতলায়”! জটাধারী তলার বেল গাছের নিচে বসে সে একমনে ধ্যান করতো! ধ্যানের গভীরের তন্ময়তায় ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেতো তার! দিনদিন শঙ্করের এইরূপ আচরণের মাত্রা বাড়তে থাকলো।

বাড়ির লোকেরা রাত্রে  ঘুমিয়ে পড়লে শঙ্কর চলে যেত জটাধারীতলায়!

এই জটাধারীতলাটি নিয়ে ওই গ্রামে তখন নানান কাহিনী চালু ছিল। যেমন — ‘এখানে বেলগাছে ব্রহ্মদত্ত বাস করে! গ্রামের মাতব্বরদের মধ্যে অনেকেই নাকি তা প্রত্যক্ষ করেছিল! নিশীথ রাতে কে যেন ব্রহ্মচারীর বেশে অর্থাৎ মাথা ন্যাড়া, আদুল গা, কৌপীন পড়া, কাঁধে যজ্ঞ পৈতা, এক হাতে কমন্ডলু অন্য হাতে দন্ড, খড়ম পায়ে বেলগাছ থেকে নেমে জলের উপর দিয়ে হেঁটে দ্বারকা নদী পেরিয়ে শ্মশানের দিকে চলে যায়!

এভাবেই জটাধারীতলার মাহাত্ম্য এখানকার মানুষজনের মুখে মুখে প্রচারিত ছিল ! বৃষ্টি হতে দেরী হলে বা বৃষ্টির সময়মতো না হলে, বর্ষার সময় গ্রামবাসীরা এই জটাধারীতলায় যজ্ঞাহুতিসহ পুজো দিয়ে জল বন্দনা কোরতো এবং তাতেই বৃষ্টি হোতো। এমন প্রবাদ‌ও আছে যে, এখানে পুজো করে বাড়ি ফেরার পথেই বৃষ্টি নেমেছে! সেই প্রাচীন কাল থেকেই এখানে যজ্ঞাহুতি দিয়ে জল বন্দনা করা হোতো।

যাইহোক, গ্রামের সকলের মনে একটা ধারনা ছিল যে, ওই জটাধারীতলায় বেলগাছে ব্রহ্মদৈত্য বাস করে তাই অন্ধকার নামলে এদিকে কেউ বড় একটা চলাফেরা করতো না, অথচ বালক শংকর গভীর রাতে একাকী এখানেই ধ্যান করতে আসতো। 

এমন কি গ্রামের মানুষজন তখন বলাবলি করতে শুরু করল যে, শংকর পাগল হয়ে গেছে! গ্রামের মাতব্বররা বলাবলি কোরতে লাগলো, — ‘শংকরকে ভূতে পেয়েছে, তাকে নিশিতে টেনে নিয়ে যায় ইত্যাদি! তারা শংকরের পিতা যোগীন দাসকে বললো —

“ভাল করে ছেলেকে ওঝা দেখাও! ঝার-ফুঁক দিলে ওর মাথা থেকে ভুত নেমে যাবে!” ওঝাও আনা হোল ! শঙ্করের আষ্টেপৃষ্ঠে ঝাঁটা মেরে সেই ওঝা তার মাথা থেকে ভুত নামাবার চেষ্টা করতে গিয়ে, তাকে মেরে মেরে একেবারে বেহুঁশ করে ফেলল।

এই অত্যাচারের ফলে শংকর জ্বরে পড়ে গেল! জ্বরের ঘোরে সে শুধু “তারা মা” “তারা মা” বলে কাঁদে ! কিছুদিনের মধ্যেই সে সুস্থ হোল কিন্তু তার পূর্বের আচরণে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হলো না। 

পিতা যোগীন দাস এর পরে বোধহয় তার ছেলের জীবনের রহস্য কিছুটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি পুনরায় গ্রামের মাতব্বরদের কথায় ওঝা না দেখিয়ে শঙ্করের কাজকর্মে আর বাধা দেয়নি।

বাবা মায়ের মৃত্যুর পরে শঙ্কর তার দাদা বৌদির আশ্রয়ে থাকে। যদিও বৌদি তাকে মায়ের মত স্নেহ ও যত্ন কোরতো, দাদা নারায়ন শংকরকে শাসন করার সুরে কিছু বলতো না! কোনদিন মাঝে মাঝে বলতো — “শংকর! তুই বড় হয়েছিস, এবার আমাকে সংসারের কাজে একটু সাহায্য কর! শুধু জঙ্গলে বসে থাকলেই কি পেট ভরবে?” কিন্তু সংসারের কথা শুনতে ভালো লাগতো না তার!! তার যখন খেয়াল হোতো, তখন সে মাঠে গরু চরাতে যেতো মাঝে মাঝে গরুর জন্য ঘাস কেটে আনতো! 

শোনা যায় শঙ্করের যখন ১৫ বছর বয়স তখন তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় এক ধরনের বিষাক্ত ঘা হয়েছিল। তার দাদা প্রথমে কবিরাজি চিকিৎসা করেন কিন্তু তাতে কোনো ফল হলো না দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসা করেও সব‌ই নিস্ফল হোলো। শঙ্করের শরীরে ঘা-এর প্রকোপ ক্রমশঃ বেড়েই যেতে থাকলো। তখন সাধ্যমত এলোপ্যাথিক চিকিৎসা করানো হোলো কিন্তু তাতেও ঘাগুলো না সেরে বরং সারা শরীরে ছড়িয়ে গেল। ঘায়ের যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে উঠল শংকর! যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না, রাতের পর রাত তাকে জেগে কাটাতে হয়! তার আপনজনেরাও অতিষ্ঠ হয়ে উঠল। শংকর কখনো “তারা মা” ” তারা মা” করে কেঁদে ওঠে, আবার কখনো “বড়দা” “বড়দা”( সাধক বামাক্ষ্যাপাকে শংকর ‘বড়দা’ নামেই সম্বোধন করতেন) বলে কাঁদে! অনেকের মুখে শুনেছিল সে__ যে, এই ঘা সারবার নয়!

সেই অবস্থায় কেউ তাকে সহ্য করতে পারতোনা রাতদিন শুধু গঞ্জনা শুনতে হতো! চারদিকে শুধু গঞ্জনা আর সেই ঘায়ের অসহ্য যন্ত্রণা –শঙ্করের জীবন যেন দুর্বিষহ হয়ে উঠল! সে শুধু চোখের জল ফেলে, আর বলে — “তারা মা, আমাকে ভালো করে দাও! তারা মা, আমাকে ভালো করে দাও!”

============

ইতিমধ্যে তখন শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ! তৎকালীন বাংলার লীগ মন্ত্রিসভা সৈন্যবাহিনীর জন্য খাদ্য সংগ্রহের নীতি গ্রহণ করলে ব্যবসায়ীরা মুনাফার লোভে সৃষ্টি করলো কালোবাজারি! সূচনা হল বাংলার বুকে দুর্ভিক্ষের দাপাদাপি! যার ফলে হয়েছিল ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ ! সেই সময় একে তো মানুষ দুবেলা দুমুঠো পেটপুরে খেতে পেতো না তার ওপরে লাগলো মড়ক! মড়কে গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ বিনা চিকিৎসায় মরতে শুরু করলো। একে তো শঙ্করের শরীরকে ওই বিষাক্ত ঘা দুর্বল করে দিয়েছিল, তার উপরে তার কলেরা শুরু হয়ে গেলো। ফলে ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ল শংকর এবং পাড়া-প্রতিবেশীরা মনে করলো শংকর মারা গেছে! হরি ধ্বনি দিতে দিতে প্রতিবেশীরা সেই মৃতদেহ নিয়ে গিয়ে হাজির হোল তারাপীঠ মহাশ্মশানে! বর্ষণমুখর সন্ধ্যা, সহযাত্রী দল শ্মশানে আসতেই শুরু হলো বৃষ্টি ! তারা শংকরের মৃতদেহ শ্মশানের এক প্রান্তে রেখে মৃতদেহ বহনকারীদের রাত্রিবাসের জন্য যে জায়গা আছে সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো। সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি গভীর হলো, কিন্তু বৃষ্টি থামলো না! এমন সময় অদ্ভুত এক কাণ্ড ঘটে গেল মরার খাটিয়া থেকে শংকর হুড়মুড় করে উঠে বসে পড়লো! সহযাত্রীরা “ভূত” “ভূত” চিৎকার করতে করতে যে যেদিকে পারলো ছুটে পালালো!

পরদিন অনেকে মিলে জুটেপুটে এসে গ্রামবাসীরা দেখল শংকর তার জন্যে সাজানো চিতার পাশে বসে আছে। সেই দিন থেকেই শংকর স্থির করে নিল যে, সে এখন থেকে শ্মশানবাসী হবে। তখন তার বয়স ছিল ১৭ বছর। দীর্ঘ রোগভোগের কারণে অসুস্থ দেহেই সে সেখানে থাকতে লাগলো। সেই সময় তারাপীঠ মহাশ্মশান এখনকার মতো মুখরিত ছিল না ! এই শ্মশান এত গভীর জঙ্গলে ঢাকা ছিল যে, দিনের আলোই সেখানে ঠিকমতো প্রবেশ করতে পারতো না। দিনের বেলাতেই মানুষজন একা একা ঢুকতে ভয় পেতো! দিবানিশি শবদেহ নিয়ে শেয়াল-কুকুরে টানাটানি চলতো, সন্ধে হোতে না হোতেই সারা শ্মশান শিয়াল কুকুরের ডাকে মুখরিত হয়ে উঠতো, গাছে গাছে চিল শকুনের বাচ্চারা এমনভাবে কাঁদতো যেন মনে হোতো কোনো মরা শিশুর প্রেতাত্মা কেঁদে কেঁদে বেড়াচ্ছে !

এই পবিত্র শ্মশানভূমি যেন ডাকিনী-যোগিনীর বীভৎস তান্ডবলীলার নৃত্যমন্ডপে পরিণত হোত।

এ হেন শ্মশানে শ্মশানচারী শংকর ক্ষ্যাপা বেশিরভাগ সময়ই সাধক বামাক্ষ্যাপার সিদ্ধাসন অর্থাৎ শিমুলতলায় পঞ্চমুন্ডির আসনের কাছাকাছি জায়গায় ঘুরে বেড়াতো! এমনকি রাত্রে ওই পঞ্চমুন্ডির আসনে বসে সাধনাও করতো শংকর! ওখানে ঐ পঞ্চমুন্ডির আসনের উপরে শিশুর মতো ঘুমিয়েও পড়তো সে! এই রকমই চলছিল শংকরের সাধন-জীবন!

কথিত আছে যে, এই সময় থেকেই শংকর ক্ষ্যাপার জীবনে চরম পরিবর্তন ঘটে যায়! শ্মশানচারী শংকর ভয়ংকর শ্মশানের মধ্যে “তারা মা” “তারা মা” বলতে বলতে ঘুরে বেড়াতো! সবসময় যেন ‘তারামা’কেই জীবনের সার করে নিয়েছে সে! কিছুদিনের মধ্যেই তার শরীরের ঘা-গুলি শুকিয়ে যেতে লাগলো ! ধীরে ধীরে রোগ মুক্ত হয়ে গেল শংকর ! শরীরের কোথাও ঘায়ের একটা চিহ্ন‌ও আর দেখা যায় না ! তার রুগ্ন জীর্ণ চেহারাই এখন আর নাই, সে এখন রীতিমত বলিষ্ঠ দেহের অধিকারী!

দীর্ঘকাল যে ঘা-এর জন্য এত কষ্ট সে ভোগ করলো, যাকে মড়ক-জনিত কারণে মৃত বলে শ্মশানে ফেলে দিয়ে আসা হয়েছিল__ সেই শংকর কোন্ মন্ত্রবলে কয়েকদিনের মধ্যেই সম্পূর্ণরূপে সুস্থ হয়ে উঠল — এই প্রশ্ন উঁকি দিয়েছিলো কৌতুহলীদের মনে! তবে, সেদিন তারা বুঝতে পেরেছিল যে, মায়ের প্রতি গভীর বিশ্বাস আর ভক্তির জোরেই শংকর তার জীবন ফিরে পেয়েছিল। শ্মশানচারী শংকরের জীবন কি করে কাটে, সে শ্মশানে কি করে এবং খায়ই বা কি এসবের খবর তখন কেউ রাখতো না। সকল মানুষ তাকে ‘পাগল’ বলেই জানতো! একজন পাগল মানুষের জন্য কে আর মাথা ঘামায়? তবে, একথা অনেকেই জানতো যে, শংকর সবসময় মুখে শুধু “তারা মা” “তারা মা” করেই মহাশ্মশানে ঘুরে বেড়ায় এবং বামাক্ষ্যাপার সিদ্ধাসন এর কাছাকাছি জায়গায় বেশিভাগ সময় কাটায়।

সে শ্মশানের বাইরে অর্থাৎ লোকালয়ের মধ্যেও মাঝে মাঝে আসতো। সেই সময় অনেকেই লক্ষ্য করতো যে, সে গরুর “পা-ওট” অর্থাৎ গরুর খুড়ে গর্ত হয়ে যাওয়া জায়গায় যে জলটুকু জমতো সেটি সে হামাগুড়ি দিয়ে পান কোরতো! এই দেখে সকলে ভেবে নিয়েছিল যে শংকর পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে শংকর লোকালয়ে আসতো ঠিকই কিন্তু সে কারো কাছে কখনো ভিক্ষা করেছে তা জানা যায়নি! তবে, শ্মশানের সেই নির্জন প্রান্তরে সে খায়ই বা কি, আর করেই বা কি এই নিয়ে স্থানীয় মানুষের কৌতূহলের সীমা ছিল না! কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মহাশ্মশানের সাধকের কাছে স্বর্গ আর সাধারণের কাছে প্রেতপুরী! তারাপীঠে তখন তেমন যাত্রী সমাগম হোতো না, মাঝে মাঝে আশেপাশের গ্রাম থেকে দু-চার জন যাত্রী মায়ের পুজো দিতে আসতো ঠিকই কিন্তু তার সংখ্যা অতি নগণ্য! দূরদূরান্তের ভক্তের সংখ্যা হাতে গোনার মতো! সে সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভাল ছিলনা বলেই হয়তো তারাপীঠে ভক্তের সমাগম ঘটতো না।

এমতাবস্থায় শংকর কিভাবে জীবিকা নির্বাহ করতো তা সত্যিই রহস্যাবৃত থেকে গিয়েছিলো সাধারণ মানুষের কাছে! তবে তারাপীঠ মহাশ্মশানের শ্মশানচারী শংকর মাঝে মাঝে তার বোনের বাড়ি ‘কৌড়বেলে’ গ্রামে তেতো। তারাপীঠ থেকে মাত্র মাইল দূয়েক দূরে এই গ্রামটি। বোনের বাড়ীতে সে কিন্তু বিশেষ খাওয়া-দাওয়া করতো না, কিছুক্ষণ থেকেই চলে আসতো। মাঝে মাঝে তার ভাগ্নেকে সঙ্গে নিয়ে আসতো তারাপীঠে! ভাগ্নের নাম মানিক, আদর করে শংকর ডাকতো ‘মানকে’- বলে! ভাগ্নেকে কাঁধে তুলে নিয়ে পথ চলতে চলতে বারবার শংকরই তারা মায়ের নাম করতো, আর মাঝে মাঝে রামপ্রসাদী গান গাইতো – “সকলি তোমারি ইচ্ছা- ইচ্ছাময়ী তারা তুমি” অথবা “এমন দিন কবে হবে তারা, যবে তারা তারা তারা বলে ‘তারা’ বেয়ে পড়বে ধারা!” কখনো কখনো শংকর ভাগ্নেকে বলতো বড়দার কথা অর্থাৎ বামাক্ষ্যাপার কথা! কিভাবে শিয়াল কুকুরের সঙ্গে একই পাতে আহার করতো, কিভাবে ভক্তের অনুরোধে বামা কঠিন কঠিন রোগ সারিয়ে ফেলতো সেই সব কথা! আরো শোনাতো কিভাবে বন্যাপ্লাবিত দ্বারকায় ঝাঁপ দিয়ে তার মায়ের শবদেহ শ্মশানে নিয়ে এসে তাঁর সৎকার করেছিলেন এবং মায়ের শ্রাদ্ধের দিন গন্ডী টেনে কিভাবে বৃষ্টি বন্ধ করেছিলেন সেই সব কাহিনী!

বামদেবের প্রতি শঙ্করের যেমন ছিল শ্রদ্ধা আর বিশ্বাস, তেমনই ছিল গভীর ভক্তি। সাধক বামাক্ষ্যাপার প্রভাব ষোল আনাই শংকরের জীবনে বর্তেছিল! তাই গ্রামের সাধারণ ছেলে ‘শংকর’ ত্যাগ, বৈরাগ্য এবং সুতীব্র সাধনার দ্বারা হয়ে উঠলেন “মহাসাধক শংকর বাবা”! তারা মায়ের কৃপাধন্য ! [এখন থেকে শংকর বাবার ক্ষেত্রে সম্মানসূচক শব্দ‌ই ব্যবহার করা হবে।]

শংকর সম্পূর্ণরূপে সাধারণের কাছ থেকে নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রেখেছিলেন অর্থাৎ তিনি যে একজন প্রকৃত সাধক বা তারা মায়ের কৃপাধন্য হয়েছেন এ কথার প্রকাশ ঘটাতে চান নি! সবার চোখেই শংকর ছিলেন “শংকর ক্ষ্যাপা”! কিন্তু হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনায় সবাই জানতে পেরেছিল যে, এ পাগল — যে-সে পাগল নয়, এ পাগল ঈশ্বরের শক্তিতে শক্তিমান একজন মহাসাধক! ঘটনাটি নিম্নরূপ :-

সেই সময় কৃষকেরা ধানক্ষেতে ‘ফলিডল’ নামে এক ধরনের কীটনাশক প্রয়োগ কোরতো। একদিন ঐ বিষ ছড়িয়ে ক্ষেতের মালিক নিয়মাফিক লাল পতাকা টাঙিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছিল! শংকর ঐ ক্ষেতের ধারে কাছে ঘোরাফেরা করছিলেন, হঠাৎ তিনি এ জমির কাছে এসে কোনো কিছু ভ্রুক্ষেপ না করে হামাগুড়ি দিয়ে ক্ষেতের জল পেট ভরে খেয়ে ফেললেন। কতকগুলি লোক ওই ক্ষেতের কাছেই কাজ করছিল। তারা ওনাকে ঐ কাজ করতে দেখেই চিৎকার করে বারণ করছিল কিন্তু সেদিকে শঙ্করের কোন ভ্রুক্ষেপই ছিলনা ! প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে ফলিডল বিষ_ তখনকার দিনে খুবই মারাত্মক ছিল বলেই ভারত সরকার এই বিষ উৎপাদন বর্তমানে বন্ধ করে দিয়েছে ! এই বিষ এতই মারাত্মক ছিল যে, বিষের খালি শিশি পুকুরের জলে ফেলে দিলেও পুকুরের সমস্ত জীব মারা যেতো। আর এই হেন মারাত্মক বিষ দেওয়া জল খেয়েছে শংকর সকলে ভাবলো আর ক্ষ্যাপার রক্ষা নাই! এবার ক্ষ্যাপা নিশ্চয়ই মারা যাবে ! ওখানে যারা উপস্থিত ছিল, তাদের চোখের সামনে এরকম একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল বলে তারা আফসোস করতে লাগল এবং বিবেকের দংশন ভোগ করতে লাগলো । কিন্তু বিষের জ্বালায় ঢলে পড়লো না ক্ষ্যাপা সে দিব্যি নিশ্চিন্তে “তারা মা”_ “তারা মা” করতে লাগলো ! তার শরীর যেমনটি ছিল তেমনটিই রয়ে গেল ! মানুষজন যারা ওখানে ছিল তারা ভাবতে শুরু করলো‘ এ কী করে সম্ভব? যে বিষ-দেওয়া ক্ষেতের জল খেলে গরু-বাছুর পর্যন্ত মরে যায় __সেই মারাত্মক বিষ হজম করে দিল শংকর ক্ষ্যাপা? এই প্রশ্ন‌ই এরপর থেকে সবার মুখে মুখে ফিরতে লাগলো।

আর একদিনের একটা ঘটনা! সেদিন শংকরকে মারাত্মকভাবে রাস্তার কুকুর কামড়ালো! চরম রক্তপাত পর্যন্ত ঘটে গেল সকলেই ভাবল জলাতঙ্ক রোগের হাত থেকে শংকরের রেহাই নেই কিন্তু এবারও তার কিছুই হলো না ! দিব্যি নিশ্চিন্তে “জয় তারা মা” “জয় তারা মা” নাম করতে থাকে এবং সুস্থ শরীরেই বর্তমান থাকে। খ্যাপার এই ধরনের আচরণে মানুষজনের কৌতূহল তার প্রতি আরো বেড়ে গেল, তারা বুঝলো যে মা তারা-ই এই ক্ষ্যাপাকে রক্ষা করে চলেছেন! ছোটবেলা থেকেই যে অদৃশ্য শক্তির বলে শঙ্করের জীবনে ভোগের কোনোদিন কোনো বাসনা হয়নি এবং ছোট থেকেই তীব্র বৈরাগ্য জন্মেছিল, তারা মায়ের প্রতি ভক্তি-বিশ্বাস জন্মেছিল সেই শক্তিই শংকরকে বার বার রক্ষা কোরতো।

একদিন শংকরকে দেখা গেল রাস্তার মোরামের ধুলোবালি মুঠো মুঠো করে ভক্ষন করছেন! তাঁর এরূপ কান্ড দেখে সকলে অবাক! কৌতূহল বেড়ে যাওয়ায় গ্রামবাসীদের কয়েকজন শংকরের কার্যকলাপ অনুসরণ করতে মনস্থ করে! দু’এক দিন তাঁকে follow করে তারা বুঝতে পারে যে, শংকর প্রতিদিন‌ই মোরাম ভক্ষণ করে! প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে অনেকেই ভাবতে থাকে তাহলে কি শংকর শ্মশানবাসী হয়ে এতগুলো বছর মোরাম-মাটি খেয়েই জীবন যাপন করছে?

শংকর সেই ছেলেবেলা থেকেই নিজেকে মা তারার চরণে সঁপে দিয়েছিলেন বলেই তারা মায়ের আশীর্বাদে রাস্তার ধুলোই তাঁর কাছে পুষ্টিদায়ক খাদ্যে পরিণত হয়েছিল, আর তাই এই খাদ্য‌ই তাঁর এতদিনকার ক্ষুন্নিবৃত্তি করেছে, তাঁর শরীরে পুষ্টি যুগিয়েছে! এখন তিনি সবার কাছে সিদ্ধ সাধক শংকর খ্যাপা বা অনেকের কাছেই তখন তিনি “শংকর বাবা”! বৈচিত্রে ভরা তাঁর জীবন! জীবনের বেশিরভাগ সময় তাঁর কেটেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে ভয়ংকর শ্মশানের মধ্যে ! তাই অজ্ঞাত তাঁর সাধক জীবন ! অজানা তাঁর সাধন পদ্ধতি ! মানুষের সামনে যখন তিনি এসেছেন তখন মানুষ দেখেছে যে, মান-অপমান, শত্রু-মিত্র সবই তাঁর কাছে সমান বলে বিবেচিত হয়েছে! তাঁর কাছে প্রিয়-অপ্রিয়, সুখ-দুঃখ, উচ্চ-নিচ, ছোট-বড়, সাধু-অসাধু ইত্যাদির কোনো ভেদ ছিল না! তিনি ছিলেন সর্বত্যাগী, অহংকারশুন্য, নিরাসক্ত সাধক। তিনি যেন বৈরাগ্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছিলেন শুধুমাত্র তারা মায়ের প্রতি ভক্তি আর বিশ্বাসের জোরে!

শংকর সবসময় মানুষজন থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন! এ স্বভাব ছিল তাঁর ছেলেবেলা থেকেই! নির্জনে তিনি শুধু তারা মায়ের নাম জপ করতেন ! “জপাৎ সিদ্ধি”_এই সত্যকে উপলব্ধি করেছিলেন শংকর। জপ করতে করতে শংকর কাপড়ে প্রস্রাব পায়খানা করে ফেলতেন। শুচি হয়ে জপ করা যায় আর অশুচি হয়ে জপ করা যায় না ! এই কথা ভুল প্রমাণ করেছিলেন শংকর ! দেহ-মন-আত্মা যেন তারা নামের নদীতে নিমজ্জিত ! তারা-ময় জীবন ছিল তাঁর!

সেদিন ছিল শনিবার ! অমাবস্যার রাত্রি ! কয়েকজন ভক্তের ইচ্ছা হোল তারা শংকর ক্ষ্যাপার সঙ্গে শ্মশানে যাবে। ক্ষ্যাপা শ্মশানে কি করে এটাই তাদের দেখার ইচ্ছা ! কিন্তু ক্ষ্যাপা কিছুতেই রাজি নয় ভক্তরাও নাছোড়-বান্দা, তারা যাবেই! কোনো উপায় না দেখে শংকর সেই ভক্তদের লক্ষ্য করে ঢিল ছুঁড়তে লাগলেন ! তবুও একসময় ক্ষ্যাপা শ্মশানে প্রবেশ করলে ভক্তরাও চুপিসারে এসে তাঁকে লক্ষ্য করতে থাকে! গভীর রাত্রি ! শ্মশান তো নয় যেন রহস্যময় প্রেতপুরী ! ক্ষ্যাপা পঞ্চমুন্ডির আসনের কাছাকাছি জায়গায় আসতেই ভক্তদের কানে এলো মেঘের গর্জন ! ফাঁকা আকাশে কর্-কর্ আওয়াজে বজ্রপাত হোতে শুরু করলো, মরা শিশুর কান্নার শব্দে এবং নারী কন্ঠের বিকট হাসিতে যেন আকাশ বাতাস বিদীর্ণ হয়ে গেল ! কৌতুহলী ভক্তের দল যে যেদিকে পারলো ছুটে পালালো ! শঙ্করের সাধনার কোনো বিঘ্ন ঘটলো না !

তারাপীঠ মহাশ্মশানের শংকর ক্ষ্যাপার অলৌকিক ক্রিয়াকান্ডের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগলো। ফলে তাঁর ভক্তের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে লাগলো। একবার এক ভক্ত তার অসুস্থ ছেলেকে এনেছেন ক্ষ্যাপার কাছে। ছেলের কঠিন অসুখ, ডাক্তার হাল ছেড়ে দিয়েছে ! তাই ভক্তটি আছড়ে পড়লেন ক্ষ্যাপার পায়ে! চোখের জলে বুক ভাসিয়ে দিয়ে বললেন “বাবা, দয়া করুন ! আমার একমাত্র ছেলেকে বাঁচান !” ক্ষ্যাপা তো প্রথমেই অশ্রাব্য গালিগালাজ শুরু করলো, তারপর বললো “শালা পাপী কোথাকার ! তোর ছেলে মরাই ভালো ! যা যা, দূর হ !” এই কথা গুলো বলেই ক্ষ্যাপা ঐ অসুস্থ ছেলেটিকে প্রচন্ড প্রহার করতে লাগলেন ! ভক্ত কাঁদতে কাঁদতে বলল “বাবা আমি মহাপাপী! জীবনে আর কোনদিন পাপ কাজ করবো না!” ক্ষ্যাপা আপন-মনে কয়েকবার বিড়বিড় করে তারা মা-র নাম উচ্চারণ করে বললেন — “তারা মা-কে ডাক্! তোর ছেলে ভালো হয়ে যাবে!” কিছুদিনের মধ্যে অসুস্থ ছেলেটি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছিল !

তারা মায়ের পাগল ছেলে শংকর ক্ষ্যাপা কখন কেমন মেজাজে থাকে তার ঠিক নাই ! কখনো মানুষ দেখলেই ইঁট-পাটকেল ছুঁড়ে মারে, আবার তাঁর কাছে মানুষজন এলে হয়তো মারধর করতে শুরু করেন। তারই মধ্যে ভক্তের দল এসেছে এবং ইচ্ছা করে মারধরও খেয়েছে আর তাতেই তাদের দূর হয়েছে রোগ ও পাপ-তাপ !

তারা মায়ের সন্তান জন্মসিদ্ধ শংকর সর্বত্যাগী, শ্মশানবাসী হয়ে গায়ে চিতাভস্ম মেখে ক্ষ্যাপার অভিনয় করে তারা লীলা করে গেলেন তারাপীঠে ! ভক্তজনের কাছে তিনিই ছিলেন সাক্ষাৎ শিব-স্বরূপ ! একমাত্র তাঁর একনিষ্ঠ ভক্তরা নিজের প্রচেষ্টায় এই যোগীর নিষ্কাম সাধনা ও সিদ্ধির কিছুটা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন এবং অনেকেই তাদের আপন আপন বাসনার সিদ্ধিও করে নিয়েছিলেন।

অনেক ভক্তই ক্ষ্যাপার জন্য দামী দামী কাপড় চোপড় ও ভালো ভালো খাবার জিনিস নিয়ে আসতো ! ক্ষ্যাপা সাধারণতঃ এই সবের কিছুই গ্রহণ করতেন না,তবে খেয়াল হলে কখনো কখনো খাবারগুলো পেটপুরে খেয়েও নিতেন ! ভক্তরা জোর করে ক্ষ্যাপার গায়ে কাপড় চোপড় জড়িয়ে দিলে কিছুক্ষণ গায়ে রেখে ছুঁড়ে ফেলে দিতেন সেগুলি!

একবার এক ভক্ত ভালো ভালো খাবার এনে ক্ষ্যাপাকে খাবার জন্যে অনুরোধ করতেই তিনি খাবার গুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললেন” শালা ! নিজের মা-বাবাকে খেতে দিস না! আর আমাকে আলছিস খ’-তে ! শালা পাপী কোথাকার!” ভক্তটি তৎক্ষণাৎ শঙ্করের পায়ে ধরে বলল” বাবা ! তুমি আমাকে রক্ষা করো !” শংকর শুধু বলল তারামাকে ডাক্ গা শালা! আমি কেউ লয়!” ‘পিতা-মাতা প্রসন্ন না হলে ধর্ম-কর্ম করে কিছু হয় না’ এ কথায় বিশ্বাস করতেন শংকর ক্ষ্যাপা ! ‘পিতা-মাতাই এই জগত সংসারে সবচেয়ে বড় জিনিস’_ এই জ্ঞান‌ই ভক্তটিকে দিলেন তিনি !

সাধক শংকর শংকর ক্ষ্যাপা কোনো যুক্তির মাধ্যমে না গিয়ে সর্ব অবস্থায় তারা মায়ের নাম করতে বলতেন। তিনি একটা কথাই বারবার বলতেন_ “তোরা সব তারা মায়ের নাম কর্, তারা মায়ের নাম কর্! এই নাম‌ই একমাত্র আশ্রয় ! নামের গুনেই জীবের সমস্ত জ্বালা দূর হয়ে যায় ! সাধক শংকরক্ষ্যাপা মনে করতেন ঈশ্বর অনুভূতিসাপেক্ষ, তিনি কখন‌ই প্রমাণ বা যুক্তিসাপেক্ষ নন। ক্ষ্যাপা ভক্তিযোগের কথাই গৃহীদের বলতেন। তারা মা-ই ঈশ্বর প্রেমীদের শান্তির পথে এগিয়ে দেন।

মাঝে মাঝেই শংকর তারাপীঠের দোকানে দোকানে ঢুকে দোকানে জিনিসপত্তর ফেলে দিয়ে নষ্ট করে দিতেন। দোকানের মালিকেরা ক্ষ্যাপাকে কখনোই গালিগালাজ করতো না বরং তাঁর এরূপ আচরণে খুব খুশি হোতো । ক্ষ্যাপা যা খুশি তাই করতে পারে তারাপীঠ যেন তারই আপন রাজত্ব ! দোকানের মালিকদের ধারণা বা বিশ্বাস জন্মেছিল _ক্ষ্যাপা জিনিসপত্র নষ্ট করলেও তাদের কোনো লোকসান হয় না বরং ক্ষ্যাপার পায়ের ধুলো দোকানে পড়লে তাদের খদ্দের বা বিক্রি ও বাড়ে এবং সত্যি সত্যিই তাই হোতো । একদিন একটা মুদির দোকানে ঢুকে এক টিন সরষের তেল ফেলে দিল ক্ষ্যাপা ! দোকানের মালিক তাঁকে গালিগালাজ না করে আনন্দে “জয় তারা”, “জয় শংকর ক্ষ্যাপা” বলে চিৎকার করে উঠেছিল!

তারা মায়ের মন্দিরের একেবারে নিচে, সিঁড়ির এক প্রান্তে বসে ‘বলরাম মন্ডল’ নামে একজন ফুলবিক্রেতা দীর্ঘদিন ধরে ফুল বিক্রি করে আসছিল। একদিন একটি ঘটনা ফুল বিক্রেতাটিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল! ঘটনাটি নিম্নরূপ :–

তখন গ্রীষ্মকাল! সেদিন মন্দিরের পাশেই একটি দোকানের খোলা বারান্দায় ফুলবিক্রেতা ঘুমিয়ে ছিল। গভীর রাতে হঠাৎ কে যেন তার গায়ে হাত দিয়ে ডাকলো_ ” এই, তাড়াতাড়ি ওঠ!” চমকে উঠে সে দেখল ধবধবে সাদা কাপড় পড়ে, খালি গায়ে কে যেন একজন দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে ! ফুলবিক্রেতা তাকে জিজ্ঞেস করল “কে আপনি ?” “আমি শংকর ক্ষ্যাপা! তোর কোনো ভয় নাই ! আমাকে দুটো ফুল দে তো !” সেই আগন্তুক বলল। শংকরক্ষ্যাপা!! ফুলবিক্রেতা নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না ! দিনের আলোয় যে শংকরকে দেখেছে, তার সঙ্গে যেন এই আগন্তুকের মিল খুঁজে পায়না সে ! এ যেন সাক্ষাৎ মহাযোগী ! বামাক্ষ্যাপার পূর্ণাবয়ব ! আগন্তুক বলল — “কই ফুল দে!” দোকানদার আবার জিজ্ঞাসা করল “এত রাত্রিতে ফুল নিয়ে কি করবে?” আগন্তুক বলল” মায়ের পাদপদ্মে দেব!”

দোকানদার — “এত রাত্তিরে? তাছাড়া এই অন্ধকারে শ্মশানের পথে ?”

আগন্তুক — “ঠিক চলে যাব ! তারা মায়ের নামের গুনে সব পরিষ্কার হয়ে যায়!”

দোকানদার তার ফুলের ধামা খুঁজে দেখল যে, সেখানে একটাও ফুল নাই। তাই সে বলল_” কিন্তু বাবা, আমার ধামাতে তো একটাও ফুল নাই! আজ যে সব ফুল বিক্রি হয়ে গেছে ! তুমি বরং কালকে এসো !”

আগন্তুক বলল “আছে রে– আছে! ভালো করে খুঁজে দ্যাখ্ !” ফুলবিক্রেতা ক্ষ্যাপার কথায় ধামাটা খুঁজতে গিয়ে দেখে, সত্যিই তো সদ্য গাছ থেকে তোলা হয়েছে এমন কয়েকটা রাঙা জবা ধামার তলাতে পড়ে আছে ! এটা দেখেই তার সারা শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেল! কোন রকমে সে ক্ষ্যাপার হাতে ফুলগুলি দিতেই ক্ষ্যাপা বলল “তারা মায়ের নাম কর্ ! তোর ভালো হবে!” এই বলে শ্মশানের দিকে চলে গেল সে! পরবর্তীতে বলরামের খুবই উন্নতি হয়েছিল।

বাকসিদ্ধ পুরুষ শংকর ক্ষ্যাপা এই কথা শুনে মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে তারাপীঠ মহাশ্মশানে এসেছে তার দুখিনী মা! মেয়ের বিয়ে হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে কিন্তু কোনো সন্তান দিতে না পারায় সংসারে অশান্তি ! স্বামী-শাশুড়ি, এমনকি পাড়া-প্রতিবেশী সকলের কাছে অবহেলিত মেয়েটি চোখের জলে বুক ভাসিয়ে ক্ষ্যাপার পায়ে লুটিয়ে পড়ে !

বিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগেও সুসভ্য সমাজে লোকচক্ষুর অন্তরালে কতশত ‘রবীন্দ্রনাথের নিরুপমা’-র চোখের জলে বুক ভাসে তার হিসাব নাই ! ক্ষ্যাপা মেয়েটির স্বামীর উদ্দেশ্যে গালিগালাজ শুরু করে দিলেন , তারপর শান্ত হয়ে বিড়বিড় করে কয়েকবার তারা মায়ের নাম উচ্চারণ করে বললেন _”হবে রে হবে, তোর ছেলে হবে! তারা মাকে ডাক্! তোর সব বিপদ কেটে যাবে !” কিছুকাল পরে মেয়েটি একটি পুত্র সন্তান লাভ করে সংসারে সকলের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছিল। ১৯৭৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। রামপুরহাট কলেজের অর্থনীতির প্রধান অধ্যাপক এবং স্বনামধন্য ব্যক্তি প্রণব কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্ত্রী তার ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তারা মায়ের পুজো দিতে। পূজার শেষে তারা শ্মশানে এসে বামাক্ষ্যাপার সমাধি মন্দিরের নিচে দাঁড়িয়েছেন এমন সময় শ্মশানের মধ্য থেকে কে যেন তাদের দিকেই এগিয়ে আসতে লাগলো! কিছু লোক “জয়শঙ্কর ক্ষ্যাপা” “জয়শঙ্কর ক্ষ্যাপা” — বলে চিৎকার করতে করতে তার পিছনে পিছনে আসছিল! লোকটি আর কেউ নয় শ্মশানচারী শংকর ক্ষ্যাপা! ক্ষ্যাপা অশ্লীল ভাষায় লোকগুলোকে গালাগালি দিচ্ছিল! একসময় শংকর ক্ষ্যাপা প্রণব বাবুর স্ত্রীর পাশে এসে থমকে দাঁড়ালো এবং তার চশমাটা খুলে নিয়ে তাঁর নিজের বাম চোখ বন্ধ করে অপর চোখ দিয়ে চশমার একটা গ্লাসকে ভালোভাবে দেখতে দেখতে মন্তব্য করল “তোর খুব কাছের মানুষ চলে যেছে রে ! তোর খুব কাছের মানুষ চলে যেছে !” এই বলে চশমাটা তার হাতে দিয়ে ক্ষ্যাপা চলে গেল। ঘটনার কিছুকাল পরেই প্রণব বাবু কঠিন রোগে ভুগে পরলোকগমন করেছিলেন।

শংকর ক্ষ্যাপার সংস্পর্শ লাভ করে অনেক রোগীর কঠিন কঠিন অসুখ সেরে গেছিলো। তাঁর আশীর্বাদে কত নিঃসন্তান পিতা-মাতা সন্তান লাভ করেছে তার ইয়ত্তা নাই। তাই ভক্তদের আনাগোনাও দিনকে দিন বাড়তে থাকলো এবং ভক্তরা তাকে খুব‌ই বিরক্ত করতে থাকলো। ভক্তের দল সবসময় ক্ষ্যাপাকে ঘিরে ধরে বসে থাকে। তাঁকে বিড়ি খেতে দিয়ে সেই এঁটো বিড়ি কুড়িয়ে খেয়ে, তাঁর হাতে মার খেয়ে বা যে কোনো ভাবে তাঁর স্পর্শ লাভ করে ভক্তরা নিজেদেরকে ধন্য মনে কোরতো।

তারাপীঠ মহাশ্মশানকে ঘিরে কত বিচিত্র লীলা! এই শ্মশানে সাধনা করেছেন বশিষ্ঠ, কৈলাস পতি বাবা, বামাক্ষ্যাপা এবং শংকর বাবা ! পরবর্তীতে হয়তো আরো অনেক সাধু-সন্ন্যাসী, যোগীরা এই মহাশ্মশানে আসবেন এবং সাধনা করে চলবেন তিলা মায়ের কৃপা লাভের জন্য।

শেষের দিকে ভক্তদের অত্যাচারের আতিশায্যে তাঁর ভাগনা মানিক দাস শংকরকে নিয়ে তার নিজের বাড়ি কৌড়বেলে গ্রামে নিয়ে আসে। কিন্তু ভক্তের দল সেখানেও ছুটে যেত ক্ষ্যাপার দর্শনে!

১৯৮৭ সালের ২৪ শে মার্চ। সেদিন সকাল থেকেই ভক্তের দল ক্ষ্যাপাকে ঘিরে রয়েছে ! সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুরের আহারের শেষে তিনি ঘরের মধ্যে ঢুকে মগ্ন হলেন মহাযোগে ! উপস্থিত ভক্তরা কেউ বুঝতেই পারলো না কখন যে সাধকের প্রাণবায়ু বেরিয়ে গেল সেকথা ! মৃত্যু হোল সাধক শংকর ক্ষ্যাপার। তাঁর ইচ্ছাতেই তাঁকে তাঁর পৈতৃক ভিটায় সমাধি দেওয়া হয়েছিল।

মৃত্যু হোল সাধক শংকরক্ষ্যাপার। তবে, পরম সিদ্ধ সাধকের মৃত্যু নাই। যতদিন ভারতবর্ষের বুকে তারাপীঠের অস্তিত্ব থাকবে, ততদিন মা তারার সঙ্গে যেমন বেঁচে থাকবেন সাধক বামাক্ষ্যাপা, ঠিক তেমনি থাকবেন মা তারার আর এক প্রিয় সন্তান সিদ্ধ সাধক শংকর বাবা।

জয় গুরু বামদেব। জয় শঙ্কর খ্যাপা’। জয় মা ব্রহ্মময়ী তারা।


জয় মা তারা 🌺🙏

Tuesday, November 1, 2022

39>कराग्रे वसते लक्ष्मीः---क्यों देखते हैं सुबह अपनी हथेलियां::---


39>कराग्रे वसते लक्ष्मीः--क्यों देखते हैं सुबह अपनी हथेलियां::---

दिन का शुभ आरंभ शुभ चीजों को देखने से होता है। इसके लिए भारतीय ऋषि-मुनियों ने हमें करदर्शनम यानी हाथों के दर्शन का संस्कार दिया है।

शास्त्रों में भी जागते ही बिस्तर पर सबसे पहले बैठकर दोनों हाथों की हथेलियों (करतल) के दर्शन का विधान बताया गया है। इससे व्यक्ति की दशा सुधरती है और सौभाग्य में वृद्धि होती है।

जब आप सुबह नींद से जागें तो अपनी हथेलियों को आपस में मिलाकर पुस्तक की तरह खोल लें और यह श्लोक पढ़ते हुए हथेलियों का दर्शन करें-

कराग्रे वसते लक्ष्मीः करमध्ये सरस्वती ।

करमूले तु गोविन्दः प्रभाते करदर्शनम ॥

अर्थात मेरे हाथ के अग्रभाग में भगवती लक्ष्मी का निवास है। मध्य भाग में विद्यादात्री सरस्वती और मूल भाग में भगवान विष्णु का निवास है। अतः प्रभातकाल में मैं इनका दर्शन करता हूं। इस श्लोक में धन की देवी लक्ष्मी, विद्या की देवी सरस्वती और अपार शक्ति के दाता, सृष्टि के पालनहार भगवान विष्णु की स्तुति की गई है, ताकि जीवन में धन, विद्या और भगवत कृपा की प्राप्ति हो सके।

हथेलियों के दर्शन का मूल भाव यही है कि हम अपने कर्म पर विश्वास करें। हम ईश्वर से प्रार्थना करते हैं कि ऐसे कर्म करें जिससे जीवन में धन, सुख और ज्ञान प्राप्त कर सकें। हमारे हाथों से कोई बुरा काम न हो एवं दूसरों की मदद के लिए हमेशा हाथ आगे बढ़ें।

कर दर्शन का दूसरा पहलू यह भी है कि हमारी वृतियां भगवत चिंतन की ओर प्रवृत हों ऐसा करने से शुद्ध सात्विक कार्य करने की प्रेरणा मिलती हैं, साथ ही पराश्रित न रहकर अपनी मेहनत से जीविका कमाने की भावना भी पैदा होती है।

आंखें भी रहेंगी स्वस्थ-जब हम सुबह सोकर उठते है तो हमारी आंखें उनींदी रहती हैं। ऐसे में यदि एकदम दूर की वस्तु या कहीं रोशनी पर हमारी नज़र पड़ेगी तो आंखों पर कुप्रभाव पड़ेगा। कर दर्शन करने का यह फायदा है कि इससे दृष्टि धीरे-धीरे स्थिर हो जाती है और आंखों पर कोई दुष्प्रभाव नहीं पड़ता।

विश्वास से मिलता हैं सब कुछ

तर्क से नेही मिलता कुछ

विश्वास में विष भी है और आस भी है, ये स्वयं पर निर्भर करता है की क्या ग्रहण करना हैं।

 <------आद्यनाथ राय चौधरी----->

==========================




Monday, September 12, 2022

38> || ক্ষণ-চর ||(সংগ্রহীত)

     38> || ক্ষণ-চর  ||


অতি চঞ্চল ও দেখতে সুন্দর এমন এক মানুষ এক  ট্রেন থেকে নামলো, কিন্তু তাকে আবার আরেক ট্রেনে উঠতে হবে একটু পরে, বোধ হয় 20 মিনিট পরেই আসবে পরবর্তী ট্রেন । সেই কারণে মাঝখানে সে অপেক্ষা করার জন্য ওয়েটিং রুমে ঢুকলো। 

ওয়েটিং রুমে ঢুকেই তার চোখ পড়ল রুমের লাইট টি নষ্ট। তাই সে একটি এনার্জি বাল্ব কিনে লাগালো। তারপর খেয়াল করলো রুমের ফ্লোরে ময়লা, তাই একটি ঝাড়ু কিনলো, এবং সে রুমটি ঝাড়ু দিলো। তারপর সে খেয়াল করলো রুমের বসার চেয়ারগুলো বেশি একটা আরাম দায়ক নয়, তাই সে একটি আরাম দায়ক চেয়ার কিনলো। এখন সে রুমটি সাজানোর জন্য কিছু জিনিস কিনে রুমটি সাজালো।

এখন সে অনেক ক্লান্ত হয়ে গেল, তাই একটু বিশ্রাম দরকার  এবং তার  আরাম দায়ক চেয়ারে বসতে যাচ্ছে এই মূহুর্তে হঠাৎ করেই ট্রেনের হর্ন শুনতে পেল এবং সে ট্রেনে উঠার জন্য রুম থেকে চলে গেল এবং ট্রেনে বসে তার গন্তব্য স্থানে চলে গেল.......আপনি ভাবছেন এই লোকের চেয়ে বোকা লোক আর পৃথিবীতে নেই।  

কিন্ত আপনি কি জানেন এই লোকটি কে?

এই লোক টি আর কেউ নয়  

আপনি - আমি!!!

অবাক হলে ও এটাই সত্য আমরাও পৃথিবীতে এসেছি সামান্য সময়ের জন্য। 

এখানে,,

১ম ট্রেন আমাদের জন্ম....

২য় ট্রেন  আমাদের মৃত্যু এবং আমাদের গন্তব্য  ( স্বর্গ  অথবা নরক )।। 

আর জগতের  জীবন  হচ্ছে ওয়েটিং রুম।।

যেখানে আমরা মাত্র  কিছু সময়  থাকবো। 

অথচ এই পৃথিবীর  জীবনকেই এমন ভাবে সাজাচ্ছি। 

যে আমরা ভুলেই গেছি আমাদের মৃত্যু খুব সন্নিকটে এবং আমাদের এই সাজানো গোছানো  দুনিয়ার সব কিছু ছেড়ে মৃত্যু নামক ট্রেনে চড়ে চলে যেতে হবে।

আমরা এই ওয়েটিং রুমটি সাজিয়ে কয় মিনিট ভোগ করতে পারবো.........!!! 

ঈশ্বর  আমাদের সবাইকে জগতের মোহ কাটিয়ে স্বর্গরাজ্যে যাওয়ার  খোরাক যোগাড় করার মনমানসিকতা দান করুন ..

       "সংগ্রহীত"

    <---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->

==========================


Saturday, September 3, 2022

37>|| ভগবান ভালবাসার কাঙাল ||(সংগ্রহীত)

   37>|| ভগবান ভালবাসার কাঙাল ||


"দ্বাপর যুগের শেষ লগ্ন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শুরু হবে। চারিদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছে। এমন সময়ে দেবর্ষি নারদ শ্রীকৃষ্ণের কাছে এসে বললেন, "প্রভু সবাই বলছে, আপনি পান্ডবদের পক্ষ গ্রহন করে, কৌরবদের সাথে পক্ষপাতীত্ব করছেন।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হাসলেন, কিছু বললেন না। তিনটি মালা নিয়ে দেবর্ষি নারদের হাতে দিলেন। বললেন, "দুই পক্ষে যাবে এই মালা তিন জনকে পরাবে। কাকে পরাবে? একটা পরাবে উত্তম জনকে, একটা মধ্যম জনকে আর একটা অধম জনকে।"

দেবর্ষি নারদ মালা তিনটি নিয়ে কৌরবদের কাছে আসলেন ও মালার কথা বললেন। দুর্যোধন সভায় বললেন, "আমি উত্তম, আমার ভাই দুঃশাসন মধ্যম। আর অধম সভায় যে কেউ হতে পারে।"

"কিন্তু কেউ অধম হতে চাইলো না। তখন রাস্তা থেকে এক জেলেকে ডাকা হলো, অধম স্বীকার করে মালা নিতে। জেলে বলল, "ছোট আছি ছোট থাকবো কিন্তু হীন হতে পারবো না।"

"তিন জনকে না পাওয়ায় দুর্যোধন মালা পেল না। এবার দেবর্ষি নারদ যুধিষ্ঠিরের সভায় গেলেন। মালার কথা ও তিন জনের কথা বলতেই যুধিষ্ঠির বললেন, "দেবর্ষি, পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ঐ আসনে বসেন। উত্তম মালা ওখানে থাকুক। মধ্যম মালাটা আপনার। কারণ আপনি ভক্তশ্রেষ্ঠ। আর অধম তো আপনার সমানে আমি যুধিষ্ঠির অধম।"

"দেবর্ষি নারদ ভগবানের কাছে ফিরে এলেন। শ্রীকৃষ্ণ বললেন, "ওখানে দুর্যোধন প্রধান। আমার স্থান নেই। যুধিষ্ঠিরের ওখানে আমার স্থান পাতা আছে। আমি আর কোথায় যাবো, এবার তুমিই বলো? তাই পান্ডবের সাথে আছি। ওরা আমাকে বড় ভালবাসে।"


"ভগবান ভালবাসার কাঙ্গাল। ভালবাসা ছাড়া আর কিছু চাই না ভগবানের। ভালবাসাতে মা যশোদার কাছে বাঁধা। ভালবাসাতে গোপীদের কাছে  ঘুরে ফিরে বার বার যান। ভালবাসাতে চিরদিন বাঁধা ভগবান। আর এই  একনিষ্ঠ ভালবাসাই হলো শুদ্ধ ভগবদ্ ভক্তি"।

          ( সংগ্রহীত)

    <-----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী---->

============================


Friday, September 2, 2022

36>|| ভগিনী ঋণ=জগদীশচন্দ্র বসু ও নিবেদিতা || ||

  36>||  ভগিনী ঋণ=জগদীশচন্দ্র বসু ও নিবেদিতা ||


এক অজানা কাহিনী৷   

"ভগিনী ঋণ" ও একজন বিজ্ঞানীর চোখে জল! 

 ১৯০০ এর শেষের দিকে  প্যারিসে জগদীশ চন্দ্র বসুর  বিজ্ঞান কংগ্রেসে পেপার পড়তে যাওয়ার ব্যাপারে ব্রিটিশ সরকার চরম বিরোধিতা করেছিল।

 একমাত্র  নিবেদিতার চেষ্টায় জগদীশ  বোস গেলেন সেই বিজ্ঞান কংগ্রেসে যোগদান করতে।

এ কাজে নিবেদিতাকে  সহায়তা করেছিলেন বিখ্যাত পণ্ডিত মানুষ  প্যাট্রিক গেডেস। 

 এই সেই প্যাট্রিক গেডেস যিনি জগদীশ চন্দ্র  বসুর  জীবনী লিখেছিলেন।


প্যারিসের বিজ্ঞান কংগ্রেস ছিল জগদীশ বসুর জীবনে একটা  টার্নিং পয়েন্ট। 

এখান থেকেই  সারা বিশ্বে তাঁর নাম ছড়িয়ে গেল।

সেই সম্মেলনে ভাষণ শুনতে স্বামী বিবেকানন্দ  ও নিবেদিতা দুজনেই সেদিন উপস্থিত ছিলেন। 


স্বামী বিবেকানন্দ সেই ভাষণের  বিবরণ দিয়েছেন তাঁর লেখায়,

"... এক যুবা যশস্বী বীর আমাদের মাতৃভূমির নাম ঘোষণা করলেন, সে - জগৎ প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানিক

জে সি বোস...ভারতবাসী,বঙ্গবাসী, ধন্য বীর!" 

 (তথ্য সূত্র,   স্বামীজির বাণী ও রচনা, ৬ষ্ঠ খন্ড, উদ্বোধন কার্যালয়, পৃ: ৯৭)


১৯০২ সালে অক্টোবর মাসে   একটি বই প্রকাশ হওয়া মাত্রই বিশ্বে আলোড়ন পড়ে গেল।

বইটির নাম হল, "রেসপন্স ইন দ্য লিভিং এ্যান্ড নন লিভিং।"

এই সেই গবেষণামূলক বই যার মাধ্যমে জে সি বোস দেখিয়েছিলেন উদ্ভিদের প্রাণ আছে।

আরো দুটি বই, " প্ল্যান্ট রেসপন্স এবং "কম্পারেটিভ ইলেকট্রোফিজিওলজি।"

এই বইগুলির পান্ডুলিপি পরিমার্জন, সম্পাদনা প্রভৃতি যাবতীয় কাজ নিবেদিতা একা করেছিলেন।

বইগুলো প্রকাশিত হওয়ার পর  জগদীশ বসুর গবেষণার বিষয় ছড়িয়ে গেল।

অবশ্যই বিজ্ঞানের মূল বিষয়টা ছিল  জে সি বোসের। 

কিন্তু বাকি কাজগুলো সব নিবেদিতা একা করেছিলেন।


জগদীশ বসুকে বিশ্বমাঝারে পরিচিত করার ক্ষেত্রে নিবেদিতা একটি স্মরণীয় অবদান রেখে গেলেন। 

 এ কাজ তিনি করেছিলেন  ভারতবর্ষকে  ভালবেসে। 


নিবেদিতা আর একটি অসাধারণ কাজ করেছিলেন।

নিবেদিতা জগদীশ বসুর "বোস ইন্সটিটিউট" গড়ে তুলতে  অর্থের  ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।

নিবেদিতাই  সারা বুলকে রাজী করিয়েছিলেন অর্থ দেওয়ার বিষয়ে।

বোস ইনস্টিটিউট এখন ভারত তথা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানকেন্দ্র।

এই বিশাল কাজটি করে গেলেন নিবেদিতা। 

যা খুব কমজন মানুষ এই খবর রাখেন।


বোস ইনস্টিটিউট নিবেদিতা দেখে যেতে পারেননি।

১৯১১ সালের সূচনায় জগদীশ বসু ও লেডি অবলা বসুর আমন্ত্রণে নিবেদিতা বিশ্রামের জন্য দার্জিলিং গেলেন।

সেখানে তিনি কঠিন আমাশয় রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাগ্রহণ করলেন।

ডাক্তার নীলরতন সরকার ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণের চিকিৎসা সত্বেও রোগের কোন উপশম লক্ষিত হল না 

বসু দম্পতি দিনরাত পরিচর্যায় নিযুক্ত রইলেন।

আপ্রান চেষ্টা করেছিলেন জগদীশ বসু, নিবেদিতাকে বাঁচানোর জন্যে।

পারলেন না বাঁচাতে।

মাত্র ৪৪ বছরে নিবেদিতা চলে গেলেন!

নিবেদিতা চলে যাচ্ছেন। 

আর একজন বিজ্ঞানীর চোখে তখন জলে  ভরে উঠছে।

আজ তাঁর জীবনের একটি পরম সম্পদ হারিয়ে গেল!

 এ জীবনে তিনি কোনদিন "ভগিনী ঋণ" শোধ করতে পারবেন না।


তাই বোস ইন্সটিটিউট উদ্বোধন হওয়ার একমাস আগে জগদীশ বসু নিবেদিতার বোন, 

মে উইলসনকে এক চিঠিতে লিখছেন,

" বসু বিজ্ঞান মন্দিরে প্রবেশ করলে চোখে পড়বে একটি ফোয়ারা ও জলধারা।

আর তার পাশেই থাকবে প্রদীপ হাতে প্রার্থনারত এক নারীর রিলিফ মূর্তি।

এখানেই বেদির নীচে রাখা থাকবে নিবেদিতার চিতাভস্ম।

আর এই  বেদির পাশে রোপন করা হবে একটি শেফালি গাছের চারা।

সেই গাছ থেকে রোজ ফুল

 ঝরে পড়বে বেদীর ওপর।

এই শেফালি গাছটির বীজ নিবেদিতা নিয়ে এসেছিলেন অজন্তা থেকে।"

(তথ্য/নিবেদিতা লোকমাতা/ ডক্টর  শঙ্করীপ্রসাদ বসু, ১ম খন্ড, ২য় পর্ব,পৃ: ৩৮০)


 দার্জিলিং- এ  নিবেদিতার সমাধি মন্দিরে লেখা আছে এই কথাগুলি,

" HERE LIES SISTER NIVEDITA WHO GAVE HER ALL TO INDIA. "


এমন " ভগিনী ঋণ"  কি কখনও শোধ করা যায়?

@ পীযূষ দত্ত। 


তথ্যসূত্রঃ

" ভারত চেতনায় ভগিনী নিবেদিতা।"/ উদ্বোধন কার্যালয়। 

শঙ্করীপ্রসাদ বসু/ "নিবেদিতা লোকমাতা".

ভগিনী নিবেদিতা/ স্বামী তেজসানন্দ/ উদ্বোধন 

স্বামীজির রচনাবলী /

 নিবেদিতার লেখা চিঠি মিস ম্যাকলাউড, সারা বুলকে।

       ( সংগ্রহীত )

     <----আদ্যনাথ রায় চৌধুরী-->

============================